প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026), ০৯: ৩৬
একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়েও বেশি নির্ধারিত হয় মেধাসম্পদের যথাযথ বিকাশের মাধ্যমে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব সমাজ জন্মগত সুযোগের চেয়ে মেধা, শ্রম ও যোগ্যতাকে সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তারাই দীর্ঘ মেয়াদে নেতৃত্ব দিয়েছে। পক্ষান্তরে, যেখানে বিশেষ সুবিধা বা শ্রেণিগত অবস্থান প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে, সেখানে মেধার বিকাশ ব্যাহত হয় এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ও বামপন্থি রাজনীতিবিদ মাইকেল ইয়ং ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত তার ‘দ্য রাইজ অব দ্য মেরিটোক্রেসি’ গ্রন্থে মেধাতন্ত্রের নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্ক করলেও, সবার জন্য উন্মুক্ত ও অভিন্ন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত করেননি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বৈষম্যহীনতা ও সমান সুযোগের দাবি যখন প্রধান হয়ে উঠেছে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষার জন্য পৃথক প্রশ্নপত্র চালুর আলোচনা নতুন করে রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার ও উচ্চশিক্ষার দর্শনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি মূলত পূর্ববঙ্গের মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক সামাজিক চুক্তি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯১১ সালে তা রদের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রতিকার হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল। ফলে এর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি জড়িয়ে রয়েছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গ্রামীণ কৃষক, জেলে, শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের সামাজিক উত্তরণের প্রধান সোপান হিসেবে কাজ করেছে এই প্রতিষ্ঠান। এমন একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান এখন নতুন কোনো বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনে ‘সমান সুযোগ’ এবং ‘বিশেষ সুবিধা’র মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সমান সুযোগের নীতি অনুযায়ী প্রতিযোগিতা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং যোগ্যতা দিয়ে সাফল্য নির্ধারিত হবে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পৃথক প্রশ্নপত্রের ধারণাটি ভর্তিচ্ছুদের মেধার ভিত্তিতে নয়, বরং তাদের শিক্ষামাধ্যমের ভিত্তিতে আলাদা শ্রেণিতে বিভক্ত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে শিক্ষার্থীর একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত ভর্তিচ্ছু পরীক্ষার্থী হিসেবে; ইংরেজি, বাংলা, মাদরাসা বা কারিগরি মাধ্যমের পরিচয় সেখানে মুখ্য হওয়া উচিত নয়। কে কতটুকু প্রস্তুত এবং উচ্চশিক্ষার জন্য উপযুক্ত, সেটিই হওয়া উচিত একমাত্র বিবেচ্য বিষয়।
জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪; 1724-1804) বলেছিলেন, ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত হলো একই ধরনের পরিস্থিতিতে একই ধরনের নীতি প্রয়োগ করা। যদি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন মানদণ্ড তৈরি করা হয়, তবে ন্যায়বিচারের সেই সর্বজনীন নীতি ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মার্কিন দার্শনিক জন রলসের (১৯২১-২০০২; 1921-2002) ‘ন্যায়বিচার তত্ত্ব’ (এ থিয়োরি অব জাস্টিস) গ্রন্থ অনুযায়ী, বৈষম্য কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যখন তা সমাজের সবচেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের উপকারে আসে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ইংরেজি মাধ্যম হলো সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও উচ্চশ্রেণির শিক্ষাধারা, যেখানে শিক্ষার্থীরা এমনিতেই উন্নত ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম ও বৈশ্বিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। সামাজিক ন্যায়বিচারের আলোকে বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন যদি কারও থাকে, তবে তা প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত, ইতোমধ্যে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির জন্য নয়।
ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়ু দেখিয়েছেন যে, শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক ক্ষমতা পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র। পরিবার ও পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ হিসেবে কাজ করে, যা তাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের এই সাংস্কৃতিক পুঁজি এমনিতেই বেশি থাকে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের জন্য পৃথক সুবিধা তৈরি করা সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিযোগিতার মাঠকে সবার জন্য সমান করা, ইতোমধ্যে এগিয়ে থাকা অংশকে আরও সুবিধা দেওয়া নয়।
পৃথক প্রশ্নপত্রের পক্ষে মেধা পাচার রোধের যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত মেধা পাচারের সমস্যাকে উচ্চশিক্ষার সুযোগের সংকটের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার একটি প্রয়াস। আসল উদ্দেশ্য হতে পারে দেশে এই বিশেষ শিক্ষাধারার বাজার সম্প্রসারণ করা এবং অভিজাত শ্রেণির সন্তানদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে উচ্চশিক্ষার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। দেশ থেকে মেধা পাচার মূলত একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার মূলে রয়েছে দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাব, গবেষণার সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষা ও প্রশাসনের রাজনীতিকীকরণ। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ধরন পরিবর্তন করে মেধা পাচার ঠেকানো সম্ভব নয়। মেধা পাচার রোধ করতে হলে শিক্ষক নিয়োগে মেধার মূল্যায়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মান উন্নয়ন করা জরুরি।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল মর্যাদা ও সমান সুযোগের লড়াই। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তখনই তার নৈতিক বৈধতা ধরে রাখতে পারে, যখন সে প্রতিযোগিতার নিয়ম সবার জন্য সমান রাখে এবং মেধাকেই মূল্যায়নের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত হবে তার শতবর্ষের ঐতিহ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখা, যেখানে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরাও সাধারণ নিয়মে সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে মেধার স্বাক্ষর রাখবে, কোনো বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে নয়।
নিবন্ধটির লেখক যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন-এর ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি।
ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়ু (১৯৩০-২০০২) দেখিয়েছেন শিক্ষা শুধু জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ক্ষমতা পুনরুৎপাদনেরও একটি ক্ষেত্র। পরিবার থেকে প্রাপ্ত ভাষাগত দক্ষতা, সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এসবই শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ (কালচারাল ক্যাপিটাল)। এই সাংস্কৃতিক পুঁজি উচ্চশিক্ষার ভর্তি কিংবা চাকরির প্রতিযোগিতার শুরুতেই কিছু শিক্ষার্থীকে এগিয়ে দেয়। বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার সঙ্গে এই সাংস্কৃতিক পুঁজির সম্পর্ক অস্বীকার করা কঠিন। ফলে যে গোষ্ঠী ইতোমধ্যেই তুলনামূলক বেশি সাংস্কৃতিক পুঁজির অধিকারী, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক সুবিধা সৃষ্টি করা সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে আরো জটিল করে তোলে। রাষ্ট্রের কাজ প্রতিযোগিতার মাঠকে সমতল করা; ইতোমধ্যে এগিয়ে থাকা অংশকে আরো এগিয়ে দেওয়া নয়।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী বাজারে অনিয়মের অভিযোগে দুই ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ…
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের একটি বাসা থেকে নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহীকে…
যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করছেন না ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন…
সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী প্রবণতায় থাকলেও তা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার বেশি হওয়ায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে…
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করতে বিদেশি ট্রেডিং পার্টনার ব্যাংকের নামে প্রারম্ভিক জমা ছাড়াই টাকা ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট…
পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন সীমান্ত চুক্তিকে আইনি ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। বিতর্কিত…
This website uses cookies.