Header Premium (728×90)

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ইসলামের বৈপ্লবিক নির্দেশনা

একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার জীবের একত্র সমাবেশই হলো জীববৈচিত্র্য। সহজ কথায়, কোনো অঞ্চলের নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে জীনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক যে তারতম্য বা বিভিন্নতা বিদ্যমান, তা-ই জীববৈচিত্র্য হিসেবে পরিচিত। জীববিজ্ঞানী ম্যাকেঞ্জির মতে, বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরের জীবদের ক্ষেত্রে একই প্রজাতির জীবের জীনগত প্রকরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির বৈচিত্র্যগুলোই হলো জীববৈচিত্র্য। জীবের এই বৈচিত্র্যময়তা মহান আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ দান। পবিত্র কোরআনের সুরা শুরার ২৯ নম্বর আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘তাঁর নিদর্শনাবলির একটি হলো, আসমান ও জমিন এবং এর মধ্যে বিস্তৃত জীবজন্তুর সৃষ্টি। নিশ্চয়ই তিনি চাইলেই সবকিছু একত্রিত করতে সক্ষম।’

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রকৃতি ও পরিবেশকে মানবসৃষ্ট সব কৃত্রিম অনিষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। গ্রীন হাউজ এফেক্ট বা পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো ভয়াবহ সংকট থেকে বাঁচতে হলে প্রকৃতিকে তার আসল রূপ ও নিজস্ব অবস্থায় অক্ষত রাখতে হবে। মানুষ যদি নিজেই জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার না করে, তবে পরিবেশ মানুষের সঙ্গে বিরূপ আচরণ শুরু করবে। ফলে পৃথিবী তার নিজস্ব রূপ, গতিময়তা ও কাঠামো হারিয়ে ফেলবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সুরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জলে-স্থলের সব বিপদ মানুষের হাতের কামাই। যাতে তারা তাদের কৃতকর্মের কুফল ভোগ করে এবং তা থেকে ফিরে আসে।’

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালা, তরুলতা, জলবায়ু, জীবজন্তু ও পশুপাখির যথাযথ সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সর্বকালে সমানভাবে কার্যকর ও টেকসই। তিনি বনাঞ্চল ও বৃক্ষভূমি বৃদ্ধির ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যদি কারও হাতে রোপণ করার কোনো চারা থাকে, এমতাবস্থায় কেয়ামত এসেও যায় এবং রোপণ করার সময় পাওয়া যায়, তাহলে তা রোপণ করা ছাড়া সে যেন দাঁড়িয়ে না থাকে।’ (উমদাতুল কারি : ১২/১৫৪)। অন্য একটি হাদিসে তিনি বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া বা ধারাবাহিক পুণ্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়-জুলুম না করে কিছু নির্মাণ করল অথবা কোনো চারা রোপণ করল, যতদিন পর্যন্ত আল্লাহর সৃষ্টি তা থেকে উপকৃত হবে, ততদিন রোপণকারী সওয়াব পেতে থাকবে।’ (উমদাতুল কারি : ১২/১৫৫)।

উদ্ভিদই হলো প্রকৃতির প্রধানতম প্রাণ, যার মাধ্যমে পরিবেশ, প্রাণী ও আবহাওয়া সপ্রাণ থাকে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি দেশের মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা জরুরি। কারণ পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকাই পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। রাসুল (সা.) যেমন বনভূমি বৃদ্ধির তাগিদ দিয়েছেন, তেমনি গাছপালা কাটা ও বন উজাড় করার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রেও তোমরা কোনো খেজুরগাছ বা অন্যান্য উদ্ভিদ কেটে ফেলো না।’ (এরশাদুল ফকিহ : ২/৩২০)।

জলবায়ু পরিবর্তন, আবহাওয়ার চরম বৈরিতা ও জলদূষণ রোধে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা মেনে চললে সহজেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব। বিশেষ করে পানির অপচয় রোধ এবং পানিতে সব ধরনের ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা পরিহার করলে আবহাওয়াজনিত দূষণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। পানির অপচয় রোধে রাসুল (সা.) অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। একবার সাদ (রা.) অজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করছিলেন। তখন রাসুল (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সাদ! পানির অপচয় করছ কেন?’ সাদ (রা.) পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘অজু করার ক্ষেত্রেও কি অপচয় হয়?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘অবশ্যই। এমনকি তুমি যদি বহমান নদী বা সাগরে বসেও অজু কর, তাহলেও অতিরিক্ত পানি ব্যবহার অপচয় হিসেবে গণ্য হবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৯)।

যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করা জলবায়ু ও পরিবেশ দূষণের অন্যতম বড় কারণ। এ জন্য রাসুল (সা.) ছায়াদার গাছের নিচে, মানুষের চলাচলের রাস্তায় ও স্থির পানিতে মলমূত্র ত্যাগ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা দুই অভিশপ্ত লোক থেকে বেঁচে থাকো।’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন, ‘তারা কে কে?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘যে ব্যক্তি লোকদের হাঁটাচলার রাস্তায় মলমূত্র ত্যাগ করে এবং যে মানুষের ছায়া গ্রহণস্থলে পায়খানা-প্রস্রাব করে।’ (মুসলিম : ১/১৮৮)। অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন স্থির পানিতে প্রস্রাব না করে।’ (মুসলিম : ১/৭৩)।

ঘরবাড়ি, আঙিনা, রাস্তাঘাট ও শহর-বন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে পরিবেশের বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। পরিচ্ছন্নতার অভাবেই পৃথিবীর বহু দেশ ও শহর ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগিতা হারিয়ে মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিষ্কার রাখো, ইহুদিরা তাদের বসবাসস্থলের চারপাশ অপরিচ্ছন্ন রাখে।’ (তাবারানি : ২/১১)।

পশুপাখি ও জীবজন্তু সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। মানুষ যদি অহেতুক প্রাণী হত্যার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তবে তা পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় কারণ হবে। এ জন্য রাসুল (সা.) কোনো প্রাণীকে অকারণে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কেউ যদি চড়ুই পাখি বা তার চেয়ে ছোট কোনো প্রাণীকেও অকারণে হত্যা করে, কেয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহিতা করতে হবে।’ (মিরকাত : ২৬৫৮)।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh

Recent Posts

নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক এমপি মোশতাক আহমেদ রুহী গ্রেপ্তার

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের একটি বাসা থেকে নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহীকে…

6 minutes ago

নিউ ইয়র্কে নামছে না নেতানিয়াহুর উড়োজাহাজ

যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করছেন না ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন…

14 minutes ago

মূল্যস্ফীতির চাপে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী প্রবণতায় থাকলেও তা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার বেশি হওয়ায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে…

16 minutes ago

টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করতে নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করতে বিদেশি ট্রেডিং পার্টনার ব্যাংকের নামে প্রারম্ভিক জমা ছাড়াই টাকা ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট…

20 minutes ago

পাকিস্তান–চীন নতুন সীমান্ত চুক্তি নিয়ে ভারতের তীব্র প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন সীমান্ত চুক্তিকে আইনি ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। বিতর্কিত…

29 minutes ago

গুলশানে ককটেল বিস্ফোরণ মামলায় ১৫ আসামির ৩ দিনের রিমান্ড

রাজধানীর গুলশানে ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার অভিযোগে করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার ১৫ আসামিকে তিন…

35 minutes ago

This website uses cookies.