Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

সহিংস বিশ্বে আজও প্রাসঙ্গিক মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি

আজ শান্তিবাদী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৬৯ সালের এই দিনে ভারতের গুজরাটের পোরবন্দরে এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই দূরদর্শী নেতা। সময়ের পরিক্রমায় তাঁর জীবনদর্শন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাঁকে এক বিশ্বজনীন চরিত্রে রূপান্তর করেছে। ফরাসি লেখক রোমাঁ রোলাঁ তাঁর ‘মহাত্মা গান্ধী’ (১৯২৪) গ্রন্থে তাঁকে ‘বিশ্বমানব’ বা ‘ইউনিভার্সাল বিয়িং’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সহিংস পৃথিবীতে তাঁর অহিংসার বাণী স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩০টি সশস্ত্র সংঘাত চলছে। এই চরম অস্থিরতার সময়ে শান্তি, সহাবস্থান ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। শান্তি প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে কেবল মহাত্মা গান্ধীই নন, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, নেলসন ম্যান্ডেলা, ডেসমন্ড টুটু ও দালাই লামার মতো শান্তিবাদী নেতাদের জীবন ও আদর্শ গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত গড়ে উঠেছিল দক্ষিণ আফ্রিকায় কাটানো একুশ বছরে (১৮৯৩–১৯১৪)। সেখানে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সময় তিনি প্রবাসী ভারতীয়দের অধিকার রক্ষায় আইনি লড়াই চালান। এ সময় তিনি বর্ণবাদের নির্মম রূপ প্রত্যক্ষ করেন এবং নিজেও নানা নির্যাতনের শিকার হন। শ্বেতাঙ্গদের জন্য সংরক্ষিত প্রথম শ্রেণির আসনে বসার অপরাধে তাঁকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই কাঠামোগত বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার অভিজ্ঞতা তাঁর মনে দ্রোহের জন্ম দেয় এবং তিনি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন গড়ে তোলেন।

১৯১৫ সালের ৯ জানুয়ারি ভারতে ফিরে এসে গান্ধীজি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বরাজ আন্দোলনের হাল ধরেন। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে পরিণত করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান দুটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল ‘সত্যের প্রতি নিষ্ঠা’ বা সত্যাগ্রহ এবং ‘অহিংসা’। তিনি বিশ্বাস করতেন, সহিংসতা দিয়ে সহিংসতা দূর করা সম্ভব নয়। তাঁর কাছে অহিংসা কোনো নিষ্ক্রিয় দুর্বলতা ছিল না, বরং এটি ছিল অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক হাতিয়ার।

গান্ধীজির জীবন ও দর্শন নিয়ে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার বই ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিজে গুজরাটি ভাষায় ‘দ্য স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ’ নামে একটি আত্মজীবনী রচনা করেন, যা পরে তাঁর বিশ্বস্ত ব্যক্তিগত সহকারী মহাদেব দেশাই ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। গান্ধীজির অহিংসার ধারণাটি হিন্দু ও খ্রিষ্টধর্মের মূল চেতনার মেলবন্ধনে সমৃদ্ধ হয়েছিল। তিনি মহাভারত, রামায়ণ ও বেদের অনুরাগী ছিলেন এবং লন্ডনে আইন পড়তে যাওয়ার সময়ও মহাভারত সঙ্গে নিয়েছিলেন। এছাড়া ইংরেজি ভাষার আধিপত্যে ভারতের স্থানীয় ভাষাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কায় তিনি সবসময় মাতৃভাষার চর্চাকে সমুन्नत রাখার তাগিদ দিতেন।

ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, ডান্ডি মার্চ এবং ভারত ছাড় আন্দোলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী। ভারত ছাড় আন্দোলনে তাঁর দেওয়া ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ (করব অথবা মরব) স্লোগান কোটি কোটি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর এই অহিংস আন্দোলনের নীতি পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে ম্যান্ডেলা বা মার্টিন লুথার কিঙের মতো নেতাদের অনুপ্রাণিত করেছে। রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি তিনি সমাজ সংস্কারেও যুক্ত ছিলেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের আজীবন সমর্থক গান্ধীজি দলিত বা নিম্নবর্ণের মানুষদের ‘হরিজন’ বা ঈশ্বরের সন্তান বলে ডাকতেন এবং অস্পৃশ্যতার প্রথাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে তিনি চরকায় সুতা কাটা ও খাদি কাপড়ের আন্দোলন গড়ে তোলেন।

ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেশভাগ চাননি মহাত্মা গান্ধী। তিনি দ্বিজাতি তত্ত্বকে ভিত্তিহীন মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে ধর্ম কখনো একটি জাতির ভিত্তি হতে পারে না। তবে তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব, জওহরলাল নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতন্ত্র এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের ধারণার দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত গান্ধীজির বহুত্ববাদী ও সহাবস্থানের চিন্তা পরাজিত হয় এবং ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতেই ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হয়।

আজকের দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় পারস্পরিক ঘৃণা, প্রতিশোধপরায়ণতা ও সহিংসতা এক রুগ্‌ণ প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মহাত্মা গান্ধীর সেই অমর বাণী অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—‘চোখের বদলে চোখ নিলে সারা পৃথিবী অন্ধ হয়ে যাবে।’ প্রতিশোধ কেবল আরেকটি প্রতিশোধের জন্ম দেয়, যা সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। শান্তিবাদী ডেসমন্ড টুটুর ভাষায়, ‘ক্ষমা ছাড়া আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’ একটি সহনশীল ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য আমাদের অবশ্যই ক্ষমা ও অহিংসার পথে হাঁটতে হবে।

তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মহাদেব দেশাই এটির ইংরেজি অনুবাদ করেন।দেশাই (১৯১৭–১৯৪২) আমৃত্যু গান্ধীর সহকারী, বিশ্বস্ত অনুগামী ও দিনলিপিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় তাঁর ওপর অসংখ্য পূর্ণাঙ্গ জীবনী প্রকাশিত হয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় নতুন কৌশল গ্রহণ করল ইরান

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে প্রশাসন নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে।

3 minutes ago

আত্রাইয়ে ছাগলের বিবাদ কেড়ে নিল বৃদ্ধের প্রাণ

নওগাঁর আত্রাইয়ে ছাগলে গাছের পাতা খাওয়াকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির জেরে প্রতিপক্ষের মারধরে মো. ইয়াছিন আলী…

17 minutes ago

রাশিয়ায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব: ২০০ জন কোয়ারেন্টিনে, সতর্ক হোয়াইট হাউস

রাশিয়ায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস। সাইবেরিয়ার একটি গবেষণাগারে…

22 minutes ago

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: রিয়াদে সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের বৈঠক

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে সৌদি আরবের…

25 minutes ago

পল্টন ও প্রেস ক্লাবের সামনে অটোরিকশা চালকদের অবরোধ ও বিক্ষোভ

রাজধানীর পল্টন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন অটোরিকশা চালকরা। তাদের…

35 minutes ago

আয়ের সিংহভাগই চলে যায় বাড়িভাড়ায়, ঢাকায় সীমিত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস

রাজধানী ঢাকায় সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়ার পেছনে। বিবিএসের…

39 minutes ago

This website uses cookies.