Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

প্যাক্স আমেরিকানা পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা ও নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান পরিস্থিতি এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের জন্ম দিয়েছে। একদিকে শান্তির আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে যুদ্ধের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে যেন এক অস্থির শান্তি বিরাজ করছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো। কিন্তু বাস্তবে লড়াই থামেনি; বরং হরমুজ প্রণালিতে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।

ইরানের ওপর হাজার হাজার বিমান হামলা চালিয়েও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য তেহরানকে বাধ্য করতে পারেনি। ইরানের দাবি, চার দশকের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র উল্টো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ বেছে নিয়েছে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। পুরো অঞ্চলে এখন শক্তি আর শক্তির প্রতীক হিসেবে কাজ করছে না; বরং তা অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের নীতি—যাকে অনেকে ‘গাজা ডকট্রিন’ বলছেন—তা কেবল হামাস বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর ওপরও আঘাত হানছে।

অনেকের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘শক্তিই ন্যায়’—এই নগ্ন নীতি প্রাধান্য পেয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভণ্ডামিপূর্ণ আচরণের পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসন আগের মতো আনুষ্ঠানিক সম্মানের ভানও করছে না। ড্রোন হামলা বা গুয়ানতানামো বে-র মতো ঘটনাগুলো দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই ‘নিয়মভিত্তিক’ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যা তারা একসময় প্রতিষ্ঠা করেছিল। তবে এই সামরিক শক্তিনির্ভর নীতি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে শক্তিশালী করার বদলে উল্টো দুর্বল করে দিচ্ছে।

যে যুদ্ধ ‘প্যাক্স আমেরিকানা’ বা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে, সেটিই হয়তো নতুন কোনো টেকসই ব্যবস্থার পথ তৈরি করতে পারে। এই নতুন ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে পারস্পরিক মর্যাদা, সংযম, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান। ইরান সংকট নিরসনে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যে জোট কাজ করছে, তা ২০১৫ সালের জেসিপিওএ-এর চেয়ে ভিন্ন এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ২০১০ সালে ব্রাজিল ও তুরস্ক ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি বিনিময়ের যে সমঝোতা করেছিল, তা ছিল এই ধারারই এক পূর্বসূরি, যা তৎকালীন প্রচলিত ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো গ্রহণ করতে চায়নি।

বর্তমানে মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশগুলো একটি অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের এই অভিন্ন নীতি ও শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার একটি বহুত্ববাদী আঞ্চলিক ব্যবস্থার দিকেই ইশারা করে। যদিও এমন ব্যবস্থা এখনো আকাঙ্ক্ষার পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সামরিক শক্তিনির্ভর নীতির ব্যর্থতা বিশ্বকে এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কাজ করবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

এশিয়ান গেমসে চীনের একক আধিপত্য, ১০০ স্বর্ণপদক জয়

আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই ১০০ স্বর্ণপদকের মাইলফলক পেরিয়েছে চীন। ২৬ সেপ্টেম্বর…

24 minutes ago

চুয়াডাঙ্গায় ৫০টি অসহায় পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি হস্তান্তর

চুয়াডাঙ্গায় ৫০টি হতদরিদ্র ও প্রতিবন্ধী পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দিয়েছে প্রত্যাশা সামাজিক উন্নয়ন…

30 minutes ago

বিশ্বমানের পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার: প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক…

38 minutes ago

শান্তিগঞ্জে হাওর ও নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি জিয়াউর, সম্পাদক রেদুয়ান

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে ‘হাওর, নদী এবং সবুজ বাঁচালে আমরা বাঁচি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট হাওর ও…

60 minutes ago

জাজিরায় পুলিশ দেখে কেক ও মোটরসাইকেল ফেলে পালালো আ.লীগ নেতাকর্মীরা

শরীয়তপুরের জাজিরায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার জন্মদিন পালনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পুলিশের উপস্থিতি টের…

1 hour ago

এশিয়ান গেমসের কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ মালয়েশিয়া

এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে মালয়েশিয়ার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ দল। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর শেষ…

1 hour ago

This website uses cookies.