Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

মক্কা চুক্তি: সৌদিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সুরক্ষায় দর-কষাকষির সুযোগ

সম্প্রতি মক্কায় সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং তুরস্কের ঘনিষ্ঠতাকে কেন্দ্র করে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি নতুন বার্তা দিচ্ছে। এই সমীকরণে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভূমিকা নিয়ে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই কৌশলগত আলোচনার সমান্তরালে একটি অত্যন্ত বাস্তব প্রশ্ন সামনে এসেছে—সৌদি আরবে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের জন্য এই চুক্তির উপযোগিতা কী? বছরের পর বছর ধরে যেসব প্রবাসী শ্রমিক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতি সচল রাখছেন, তাঁদের নিরাপত্তা, মজুরি ও আইনি সুরক্ষার বিষয়টি এই বড় কূটনৈতিক আলোচনায় কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাস্তবতা হলো, মক্কা চুক্তি কোনো শ্রম অধিকার সনদ নয়, বরং এটি একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি। কোনো পক্ষ সশস্ত্র হামলার শিকার হলে অন্য পক্ষ পাশে দাঁড়াবে—এমন নিরাপত্তাকেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতিই এর মূল ভিত্তি। ফলে বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যুক্ত হলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রবাসীদের বেতন বাড়বে, বকেয়া মজুরি দ্রুত শোধ হবে কিংবা নির্যাতিত নারী গৃহকর্মীরা রাতারাতি আইনি সুরক্ষা পাবেন, এমন ভাবার কোনো সুযোগ নেই। তবে এই চুক্তি সরাসরি শ্রমিকদের সুরক্ষা না দিলেও, এর সূত্র ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক দর-কষাকষির একটি বড় রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিণত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উচিত এই বন্ধুত্বের যথার্থ মূল্য নির্ধারণ করা।

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও এর মধ্যে একটি মৌলিক বৈপরীত্য রয়েছে। ঢাকা রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার কথা যতটা জোরালোভাবে বলে, সৌদিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় রিয়াদকে ততটা শক্ত অবস্থানে দেখা যায় না। অথচ একজন শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর তাঁর পরিবার, সমাজ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি নির্ভরশীল। তাই সৌদি আরবের নিরাপত্তা যদি বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়, তবে সৌদি অর্থনীতিতে অবদান রাখা বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকারকেও পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় করা উচিত। মক্কা চুক্তিকে কেবল প্রতীকী মুসলিম ঐক্যের প্রকল্প হিসেবে না দেখে, এর বিনিময়ে রিয়াদের কাছ থেকে শ্রমিক সুরক্ষায় দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি আদায় করা প্রয়োজন।

সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রমবাজারে কিছু সংস্কার আনলেও গৃহকর্মীরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণ শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে রয়েছেন। এছাড়া অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয়, দালালনির্ভরতা, চুক্তির সঙ্গে কাজের অমিল, পাসপোর্ট জব্দ এবং নির্যাতনের মতো সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ যদি এই চুক্তিতে অংশ নেওয়ার কথা বিবেচনা করে, তবে রাষ্ট্রীয় দর-কষাকষির অংশ হিসেবে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা যেতে পারে। প্রথমত, সৌদি আরবের সঙ্গে একটি স্বতন্ত্র শ্রমিক সুরক্ষা প্রটোকল দাবি করা উচিত, যেখানে বেতন আটকে যাওয়া, চুক্তি ভঙ্গ বা নির্যাতনের শিকার হলে দ্রুত আইনি প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি থাকবে।

দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে প্রধান কূটনৈতিক দাবি হিসেবে তুলে ধরতে হবে। বিদেশ যাওয়ার আগে একজন শ্রমিক যাতে ঋণের জালে জর্জরিত না হন, সেজন্য রিক্রুটিং এজেন্সির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, একটি জাতীয় ডিজিটাল কন্ট্রাক্ট রেজিস্ট্রি এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার আন্তসংযোগের মাধ্যমে ভিসা ও কাজের বিবরণের সত্যতা যাচাইয়ের যৌথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চতুর্থত, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার সক্ষমতা ও শ্রম উইংয়ের সেবার পরিধি বাড়াতে হবে, যাতে সেটি প্রবাসীদের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। প্রতিটি শ্রমিকের জন্য একটি নিরাপদ ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করে অভিযোগের অগ্রগতি ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।

সর্বোপরি, বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্কের গভীরতা শুধু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর বা বিনিয়োগের অঙ্কে না মেপে, প্রতিবছর কত শ্রমিকের সমস্যার সমাধান হলো এবং গড় নিয়োগ ব্যয় কতটা কমল—সেটিকে সম্পর্কের পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর বা সাফল্যের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। মক্কা চুক্তিতে যোগদান যেন কেবল সৌদি আরবের প্রতি একমুখী আনুগত্যে রূপ না নেয়। সৌদি আরবের বিশাল শ্রমবাজার যেমন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলাদেশি মানবসম্পদও সৌদি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্কের আলোচনায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদাকে কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

ঢাকা ও উপকণ্ঠের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে এডিবির ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ

রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ আধুনিকায়ন করতে ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন…

49 seconds ago

গাজীপুরে ট্রাক ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩

গাজীপুর মহানগরের ধীরাশ্রম এলাকায় ট্রাক ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর…

18 minutes ago

জাতিসংঘে এরদোয়ানের ভাষণের সময় মোবাইল ফোনে মগ্ন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের ভাষণের সময় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার…

25 minutes ago

মাগুরায় বেশি দামে সার ও মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ বিক্রি, ১ লাখ টাকা জরিমানা

মাগুরার শ্রীপুরে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ ও কীটনাশক…

28 minutes ago

গণমাধ্যমে সরকার ও বিরোধী দলের কথা সমান গুরুত্বের দাবি শফিকুর রহমানের

গণমাধ্যমে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের বক্তব্যও তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয়…

36 minutes ago

কোনো শিশুই শিক্ষার বাইরে থাকবে না: সমাজকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ হোসেন

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিংবা স্বাভাবিক—কোনো শিশুকেই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে না বলে জানিয়েছেন মহিলা…

38 minutes ago

This website uses cookies.