Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

ট্রাম্পের ওপর সৌদি যুবরাজের ভরসা ও আবারও হতাশার নেপথ্য

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আবারও যে সুরক্ষার ভরসা রেখেছিলেন, তার ফলাফল আগের মতোই হতাশাজনক হয়েছে। সম্প্রতি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতি বিদ্রোহীরা অগ্রগতি নিশ্চিত করার পর, মার্কিন সামরিক হামলার অনুরোধ জানিয়ে ট্রাম্পকে দুবার ফোন করেছিলেন সৌদি যুবরাজ। তবে যুবরাজের সেই অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামরিক হামলার পরিবর্তে তিনি কেবল গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।

মোহাম্মদ বিন সালমান কেন আবারও ট্রাম্পের ওপর আস্থা রেখেছিলেন, তা এক বড় প্রশ্ন। কারণ এর আগেও তাঁর এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে যখন সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা হয় এবং যার জন্য ওয়াশিংটন ইরানকে দায়ী করেছিল, তখন তেহরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে ট্রাম্পের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে সৌদি আরবকে রক্ষা করার কোনো প্রতিশ্রুতি তিনি কখনো দেননি।

দীর্ঘদিন ধরে রিয়াদ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এই ভুল ধারণা কাজ করছে যে, চরম নিরাপত্তা সংকটে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে। তবে বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি অকার্যকর ও মৃত। ইরান সংঘাত প্রমাণ করেছে যে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন সুরক্ষার বদলে অনিরাপত্তার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ইরানকে ঠেকাতে তৈরি করা এসব ঘাঁটি উল্টো তেহরানের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। সিআইএর সাবেক পরিচালক ডেভিড পেট্রেয়াসও স্বীকার করেছেন যে, ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এসব ঘাঁটি এখন আর কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

এই পুরোনো ব্যবস্থার পতনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ও সর্বজনীন যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর ‘বেটার অর্ডার প্রজেক্ট’-এর মূল ভিত্তিই হলো মধ্যপ্রাচ্যের ব্যর্থ সামরিক প্রতিরোধ ও বিদেশি হস্তক্ষেপের রাজনীতি বাদ দিয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামোতে কোনো পক্ষভিত্তিক বাহ্যিক জোট থাকবে না, বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হাতেই থাকবে এর মূল দায়িত্ব। এখানে তুরস্ক, পাকিস্তান কিংবা ইরাককে আর প্রান্তিক দেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই এবং ছোট দেশগুলো কোনো পরাশক্তির হাত ধরে টিকে থাকবে—এমন ভাবাও ভুল। এই নতুন কাঠামোতে প্রধান প্রধান দেশগুলো একটি স্থায়ী সংস্থার অধীনে কাজ করবে, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ন্ত্রণ, সংকটকালীন যোগাযোগ, সংঘাত নিরসন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে।

এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামো উপসাগরীয় অঞ্চলকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত থেকে আলাদা করে দেখবে না। ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না করে কেবল নতুন কোনো নিরাপত্তা চুক্তি করলে তা উল্টো অস্থিতিশীলতা বাড়াবে। এই মডেলে ইসরায়েলের যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে, তবে তার শর্ত হবে ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করা। এটি ২০০২ সালের ‘আরব পিস ইনিশিয়েটিভ’ কিংবা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর চেয়ে আলাদা, কারণ এটি ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার স্বীকারের বিনিময়ে ইসরায়েলকে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হওয়ার প্রস্তাব দেয়।

এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও লাভজনক হবে, কারণ মার্কিন জনগণ দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে অনর্থক সেনা ও সম্পদ না ঢেলে তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার পক্ষে। ওয়াশিংটন চাইলে সামরিক উপস্থিতি কমিয়েও কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এ অঞ্চলের অংশীদার থাকতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা স্নায়ুযুদ্ধের চরম মুহূর্তে ‘হেলসিঙ্কি প্রক্রিয়া’র জন্ম হয়েছিল, তেমনি বর্তমান সংকটও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি টেকসই ও শান্তিময় ভবিষ্যতের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তবে এর জন্য আঞ্চলিক নেতাদের কোনো কাল্পনিক মার্কিন ত্রাতার ওপর নির্ভর না করে নিজেদের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিজেদেরই নিতে হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

হামের উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১২৭০ জন

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন…

1 minute ago

ঢাকা ও উপকণ্ঠের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে এডিবির ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ

রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ আধুনিকায়ন করতে ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন…

2 minutes ago

গাজীপুরে ট্রাক ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩

গাজীপুর মহানগরের ধীরাশ্রম এলাকায় ট্রাক ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর…

20 minutes ago

জাতিসংঘে এরদোয়ানের ভাষণের সময় মোবাইল ফোনে মগ্ন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের ভাষণের সময় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার…

26 minutes ago

মাগুরায় বেশি দামে সার ও মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ বিক্রি, ১ লাখ টাকা জরিমানা

মাগুরার শ্রীপুরে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ ও কীটনাশক…

30 minutes ago

গণমাধ্যমে সরকার ও বিরোধী দলের কথা সমান গুরুত্বের দাবি শফিকুর রহমানের

গণমাধ্যমে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের বক্তব্যও তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয়…

37 minutes ago

This website uses cookies.