Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

ভারত সফর ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সফরটি আদৌ হবে কি না, হলে কবে হবে, কিংবা কোন প্রেক্ষাপটে হবে—এসব প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ঘটনাপ্রবাহ দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তি-সমীকরণ সম্পর্কে কী বার্তা দিচ্ছে। অনেকের কাছে বিষয়টি নিছক একটি দ্বিপাক্ষিক সফরসূচির প্রশ্ন মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পুণর্বিন্যাস, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, চলমান বিচার প্রক্রিয়া, ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উদীয়মান কৌশলগত বাস্তবতা।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পর হঠাৎ সৃষ্ট নতুন পরিস্থিতি উভয় দেশকেই নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করেছে। বিশেষত শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের বাংলাদেশি দাবি সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল মাত্রা যোগ করেছে। এ প্রশ্নে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। বাংলাদেশের একাংশের মতে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের শামিল। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান হলো, বিষয়টি মূলত মানবিক ও আইনগত—আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্তাবলি অনুযায়ী যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দুই যুক্তিরই নিজস্ব ভিত্তি আছে, এবং এই মতপার্থক্যই আসলে সম্পর্কের বর্তমান জটিলতার কেন্দ্রবিন্দু।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল শেখ হাসিনা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ রাখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে সমান গুরুত্ব বহন করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন। দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং চলমান বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। ভারতের নীতিনির্ধারক মহলের একাংশ মনে করে, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে কোনো না কোনোভাবে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে রাখা প্রয়োজন। বিপরীতে বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক শক্তি ও নাগরিক সমাজের মত হলো, বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্ন তোলা ন্যায়বিচারের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন দুই দেশের কূটনীতির একটি মূল চ্যালেঞ্জ।

এখানেই একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—ভারত কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চায়, নাকি কেবল একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র দেখতে চায়? এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই, কারণ রাষ্ট্রসমূহ সাধারণত আদর্শগত বিবেচনার চেয়ে কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়—ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে দিল্লি স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পরিবেশ চায়, যা তার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূল। তবে এর বিপরীত যুক্তিও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার আন্তর্জাতিক নীতি—এই দুটি বিবেচনাও দিল্লির নীতিনির্ধারণে সমান গুরুত্ব বহন করার কথা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবেই ভারসাম্যমুখী। "সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়"—এই নীতির ভিত্তিতে দেশটি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপরিচয়ের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে নতুন কোনো পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে না দেখে, বরং পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুরোনো নীতির নতুন প্রয়োগ হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত। এই সমীকরণে চীনের ভূমিকাও উপেক্ষা করার নয়। অবকাঠামো, বন্দর, জ্বালানি ও বিনিয়োগ খাতে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভারতকে সতর্ক রাখছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে বাংলাদেশ আজ এমন এক ভূরাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষই দেশটির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি যেমন তৈরি করে, তেমনি কূটনৈতিক সুযোগও এনে দেয়—যদি তা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিছক একটি প্রথাগত কূটনৈতিক কর্মসূচির চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। সফরটি অনুষ্ঠিত হলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন, সীমান্ত নিরাপত্তা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার ঘাটতি কমানোর একটি সুযোগও তৈরি করতে পারে। বিপরীতভাবে, সফর যদি প্রত্যাশিত ফল না দেয় বা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়, তাহলে তা সম্পর্কের সংবেদনশীলতাকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বলে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ কিংবা রাজনৈতিক মতপার্থক্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কোনো সম্পর্কই কেবল আবেগ, ব্যক্তিবিশেষ বা কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে না; তা টিকে থাকে পারস্পরিক স্বার্থ, বাস্তবতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রেও এই সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা মূলত সফরসূচি নির্ধারণের কারিগরি সমস্যা নয়; বরং তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বদলে যাওয়া বাস্তবতার প্রতিফলন। এখানে যেমন রয়েছে শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রশ্ন, তেমনি রয়েছে ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগ, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। এই সফরের সাফল্য বা ব্যর্থতা তাই কেবল একটি কূটনৈতিক ঘটনার ফলাফল হবে না; বরং তা নির্ধারণ করবে আগামী বছরগুলোতে ঢাকা ও দিল্লি পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে কি না। কারণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের স্থিতিশীলতা শুধু দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়—তা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh

Recent Posts

সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাবউদ্দিন হত্যায় রেস্টুরেন্ট কর্মচারী জালালের স্বীকারোক্তি

সিলেটের শাহপরানে প্রবীণ ব্যবসায়ী শাহাবউদ্দিনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার রোমহর্ষক স্বীকারোক্তি দিয়েছে ঘাতক রেস্টুরেন্ট কর্মচারী জালাল…

16 minutes ago

বেসিস নির্বাচন: ২৬ সেপ্টেম্বর ভোট, চূড়ান্ত তালিকা ৫ সেপ্টেম্বর

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নির্বাচন ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।…

23 minutes ago

ব্রুকলিনে বাংলাদেশি ইউসুফ হত্যা: ঘাতকের ছবি প্রকাশ করল নিউইয়র্ক পুলিশ

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনে বাংলাদেশি মো. ইউসুফকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন ৩১ বছর বয়সী জেসাস অ্যাকোস্তার…

29 minutes ago

চারজনের খুনের রহস্য উন্মোচনে ব্যর্থতা সরকারের চরম ব্যর্থতা: গোলাম পরওয়ার

সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার কোনো ক্লু এখনো আইনশৃঙ্খলা…

38 minutes ago

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ পেলেন ইমদাদুল হুদা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন…

53 minutes ago

সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট: সংস্কার নিয়ে ক্ষোভ

সরকার আংশিক সংস্কারের পথে হাঁটছে এমন অভিযোগ এনে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। বৃহস্পতিবার…

1 hour ago

This website uses cookies.