Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: জাজান হামলার পর নতুন সমীকরণ ও বাংলাদেশের স্বার্থ

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মূল কথা হলো, তিন দেশের কোনো একটিতে সশস্ত্র হামলা হলে সেটি তিনটির ওপরই হামলা বলে গণ্য হবে। এর মাত্র দুই দিন পর ৯ আগস্ট ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জাজান এলাকায় আরামকো তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালায়। আগুন নেভানো সম্ভব হলেও এই হামলা একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—এই হামলাকে কি এখন তুরস্ক ও পাকিস্তানের ওপরও হামলা হিসেবে ধরা হবে? কারণ, নতুন চুক্তির সামরিক নিয়মকানুন এখনো স্পষ্ট নয় এবং জাজান হামলার পর তুরস্ক ও পাকিস্তান ঠিক কী ধরনের সহায়তা দেবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

অনেকেই এই জোটকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে ডাকতে শুরু করেছেন, তবে বাস্তবতা হলো এটি এখনো ন্যাটোর মতো শক্তিশালী কোনো সামরিক জোট নয়। ন্যাটোর মতো এর নিজস্ব কোনো স্থায়ী সেনা কমান্ড, যৌথ গোয়েন্দা কাঠামো বা পরীক্ষিত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। এখন পর্যন্ত এটি মূলত একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই চুক্তিকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে এখানে মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি ও সৌদিভিত্তিক স্থায়ী সচিবালয় গঠন করা হবে। এমনকি মিসরও ভবিষ্যতে এতে যোগ দিতে পারে। কিন্তু প্রথম কমিটির বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত সামরিক সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্ট নয়, আর এই ঘাটতিই জাজান হামলাকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে।

এই চুক্তির সময় কিন্তু মোটেও আকস্মিক নয়। ২০২৩ সাল থেকে গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও লোহিত সাগরের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে আক্রমণ করে, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। ইরান ও তার মিত্রদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল-গ্যাসের স্থাপনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই বাস্তবতায় তিন দেশ একই ঢিলে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে। সৌদি আরব তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তা নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প অংশীদার তৈরি করতে চায়, যেখানে তারা অর্থ ও জ্বালানি প্রভাব দিতে পারে। তুরস্ক নিজেদের একটি স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায় এবং তারা এই জোটে ড্রোন প্রযুক্তি, যুদ্ধজাহাজ ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি আনতে পারে। অন্যদিকে পাকিস্তান তাদের সামরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থায়ন ও কূটনৈতিক সমর্থন পেতে চায়। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে সৌদি আরব ৮৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, তুরস্ক ৩০ বিলিয়ন ও পাকিস্তান ১১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার সামরিক খাতে খরচ করেছে। তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক ব্যয় ১২৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ।

তবে এখানে একটি বড় সতর্কতা আছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি থাকলেও মক্কা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৌদি আরব বা তুরস্ককে পারমাণবিক সুরক্ষা দেবে—এমন কোনো প্রকাশিত অঙ্গীকার নেই। রয়টার্সের ১৯ মে ২০২৬ সালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার পাকিস্তানি সেনা, ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং ড্রোন মোতায়েন আছে, কিন্তু এটি পুরোনো সৌদি-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ, ৭ আগস্টের মক্কা চুক্তির ফল নয়। হুতিদের ড্রোন হামলাকে চুক্তির ‘সশস্ত্র আক্রমণ’ হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো এখানেও জাতীয় আইন ও সংসদের অনুমোদনের বিষয় থাকায় ‘একজনের ওপর হামলা সবার ওপর হামলা’—এই বাক্য তিন রাজধানীতে তিন রকম অর্থ বহন করতে পারে।

ইতিহাসের শিক্ষা পরিষ্কার—শুধু যৌথ ঘোষণাই যুদ্ধক্ষমতা তৈরি করে না। ১৯৫০ সালের আরব লীগের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে কার্যকর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া গড়তে পারেনি। সেন্টো ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। পেনিনসুলা শিল্ড ১৯৯০ সালে কুয়েত দখল ঠেকাতে পারেনি। ২০১৫ সালের ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশনও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটে পরিণত হয়নি। বর্তমান চুক্তিতে গাজা, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক বাধ্যবাধকতা নেই, তাই একে ইরান বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিশ্চিত সামরিক বলয় বলা যাবে না। এটি মূলত তিন দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও দর–কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা। তবে তিনটি সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্রের এই সহযোগিতা কার্যত ইরানবিরোধী জোটে পরিণত হলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বাড়বে।

বাংলাদেশের স্বার্থ প্রধানত জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬৩ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক থেকে, যার মধ্যে সৌদি আরবের অংশ প্রায় ৩৫ শতাংশ। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাব বলছে, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। যদি এই জোট সংঘাত প্রতিরোধ করে, তাহলে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। কিন্তু এটি যদি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা বা পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়ায়, তাহলে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং বাড়বে মূল্যস্ফীতি। তাই ঢাকার লক্ষ্য কোনো জোটকে আবেগ দিয়ে সমর্থন করা নয়; বরং নৌপথ উন্মুক্ত রাখা, জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য করা এবং উত্তেজনা কমানোর কূটনীতিকে সমর্থন করা।

মক্কা জোট এখনো ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নয় এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের অবস্থানেও পৌঁছায়নি। এটি মূলত সৌদি আরবের নিরাপত্তা বৈচিত্র্যকরণ, তুরস্কের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পাকিস্তানের সামরিক-কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর একটি যৌথ উদ্যোগ। জোটটির বাস্তব পরীক্ষা জাজান, আর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার বড় পরীক্ষা ফিলিস্তিন ইস্যু। যদি তিন দেশ যৌথ কমান্ড, আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা বিনিময়, অর্থায়ন ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া কাঠামো গড়ে তুলতে পারে এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়, তাহলে জোটটি আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারবে। তাই মক্কা জোট কোনো সাম্রাজ্য নয়—এটি একটি উচ্চঝুঁকির কৌশলগত বাজি, যার সাফল্য নির্ভর করবে প্রথম বড় সংকটে সদস্যদের বাস্তব ঐক্যের ওপর।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

পীরগঞ্জে তালা কেটে সাড়ে ৫ লাখ টাকার মালামাল চুরি

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সামনে অবস্থিত মেসার্স ফরহাদ অটো পার্টস কর্নারে চুরির ঘটনা ঘটেছে। বুধবার…

2 minutes ago

তদন্তের মধ্যেই নেপালে ফিরলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা

সিঙ্গাপুরে দীর্ঘ পাঁচ মাস চিকিৎসার নামে অবস্থানের পর নেপালে ফিরেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা।…

18 minutes ago

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে কিশোরগঞ্জে সড়ক সংস্কারে তোড়জোড়

প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফরকে ঘিরে ইটাখোলা-মঠখোলা-কটিয়াদী আঞ্চলিক মহাসড়কের ১২ কিলোমিটার অংশে দিনরাত চলছে জরুরি সংস্কারকাজ।

20 minutes ago

সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে ম্যাক্স গ্রুপ

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা ও উন্নয়নকে সামনে রেখে ২০ কোটি টাকার সরঞ্জাম অর্ডারের মাধ্যমে…

30 minutes ago

সেপ্টেম্বর থেকে মেট্রোরেলের সময় বাড়ছে, শেষ ট্রেন রাত ১১টায়

আগামী সেপ্টেম্বর থেকে মেট্রোরেল চলাচলের সময় আরও ২০-৩০ মিনিট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট…

35 minutes ago

সাতক্ষীরায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে স্থবির জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য

সাতক্ষীরা জেলায় ২৪ ঘণ্টায় অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা,…

36 minutes ago

This website uses cookies.