Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

হামের থাবায় একের পর এক শিশুর মৃত্যু, সন্তান হারিয়ে মা-বাবার হাহাকার

বিয়ের দীর্ঘ ১১ বছর পর প্রথম সন্তানের মুখ দেখেছিলেন ফারজানা ইসলাম ও হেলাল ভূঁইয়া দম্পতি। আইভিএফ বা টেস্টটিউব পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া সেই ছেলের নাম রাখা হয়েছিল ফাইয়াজ হাসান তাজিম। মা ফারজানা ছেলের প্রতি ভালোবাসায় নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নাম বদলে রেখেছিলেন ‘তাজিম এর আম্মু’। কিন্তু গত ২২ এপ্রিল মাত্র ৮ মাস ১৮ দিন বয়সে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তাজিম। আগামী ৪ আগস্ট তার প্রথম জন্মদিন পালনের কথা ছিল। সন্তান হারানোর তীব্র যন্ত্রণা বুকে চেপে মুঠোফোনে ফারজানা ইসলাম বলেন, "হামে মৃত্যু এক হাজার পার হইছে। দেখতেছি তো। এ নিয়ে বলে তো কোনো লাভ হবে না। বাঁচতে হবে, তাই আমরা সন্তানহারা বাবা-মা বাধ্য হয়ে বেঁচে আছি।"

গত মার্চ মাস থেকে সন্তানকে বাঁচাতে লড়াই শুরু করেছিলেন ফারজানা ও হেলাল দম্পতি। চাঁদপুর থেকে শুরু করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে ছেলেকে নিয়ে ছুটেছেন তারা। নিউমোনিয়ার চিকিৎসার খরচের বাইরে শুধু ১৭ দিন হামের চিকিৎসার পেছনেই বিভিন্ন হাসপাতালে তাদের ব্যয় হয়েছে চার লাখ টাকার বেশি। তাজিমের হামের টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার তারিখ নির্ধারিত ছিল ১ মে। কিন্তু সেই তারিখ আসার আগেই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড়ের প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সে।

তাজিমের মতো একই নির্মম নিয়তির শিকার হতে হয়েছে ৪ বছর ৩ মাস বয়সী আকিরা হায়দার আরশিকে। গত ২ এপ্রিল রাজধানীর মিরপুরের ডা. এম আর খান শিশু হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথের পিআইসিইউতে মারা যায় সে। আকিরা দীর্ঘ ২৭ দিন ধরে নিউমোনিয়া ও হামের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। আকিরার মা সানজিদা হক জানান, হাম যে এতটা ভয়ানক হতে পারে, তা তাঁর জানা ছিল না। আকিরা বাঁচতে চেয়েছিল, নিজেই ওষুধ খেত এবং অক্সিজেনের মাস্ক চেপে ধরত। সানজিদা আক্ষেপ করে বলেন, মেয়ের হার্টে ছিদ্র ধরা পড়ায় নির্ধারিত সময়ে তাকে হামের টিকা দেওয়া যায়নি। পরে ছোট ছেলের সঙ্গে তাকে টিকা দিতে চাইলে টিকাকেন্দ্র থেকে টিকার সংকটের কথা বলে আগে ছেলেকে দিতে বলা হয়েছিল।

সানজিদা হক অভিযোগ করেন, ঠান্ডা-জ্বরের জন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময়ই তাঁর মেয়ে হামে আক্রান্ত হয়েছিল। হাসপাতালগুলোতে শিশুদের হামের চিকিৎসার বেহাল দশা তুলে ধরে তিনি বলেন, একই ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত ও সাধারণ শিশুদের একসঙ্গে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আকিরার বাবা আল আমিন ফেসবুকে এক পোস্টে তাঁর গভীর কষ্টের কথা তুলে ধরে লিখেছেন, যে বয়সে হাত ধরে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই বয়সে মেয়ের মৃতদেহ কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে।

হামের এই মরণকামড় থেকে রেহাই পায়নি আট মাস বয়সী শিশু ফাতেমাও। গত ২৩ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের সাইনবোর্ড মোড়ে বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে। ফাতেমার যমজ বোন খাদিজা ৩৬ দিন হাসপাতালে লড়াই করে বেঁচে ফিরলেও এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়। ফাতেমার মা সায়মা বেগম ও নানি সোনিয়া আক্তার এখন সারাক্ষণ খাদিজাকে নিয়ে আতঙ্কে থাকেন। সোনিয়া আক্তার জানান, গত এপ্রিলে দুই নাতনিকে ভর্তি করাতে গিয়ে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরতে হয়েছে তাদের। কোথাও সিট ছিল না, কোথাও ছিল না অক্সিজেন বা পিআইসিইউ। একই সময়ে সায়মার বড় মেয়ে তিন বছর বয়সী আয়েশাও অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আয়েশা বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

হাসপাতালে বড় নাতনিকে ভর্তি করাতে এসে ফাতেমার স্মৃতিতে কাঁদছিলেন সোনিয়া আক্তার। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ভুলন তো যায় না। দেশে হামে এত শিশু মইরা যাইতেছে, সরকার ভালো কইরা তো কোনো উদ্যোগও নিল না। এহন তো আবার শুরু হইছে ডেঙ্গু।"

পারিবারিক পরিচয়হীন ও পরিত্যক্ত শিশুদের আশ্রয়স্থল রাজধানীর আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের শিশুদের ওপরও হামের আঘাত এসেছে। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে হাম ও হাম-সংক্রান্ত জটিলতায় মারা গেছে ৮ মাস বয়সী মাহির, ৯ মাস বয়সী খুশবু, এক বছরের কিছু বেশি বয়সী আরিশা, ৩ মাস ১৮ দিন বয়সী মুনা এবং ৫ মাস বয়সী মেহেদি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকা এই শিশুদের মৃত্যুর পর কাফনের কাপড় সরিয়ে শেষবারের মতো দেখার মতো কোনো স্বজন ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দাবিদার না থাকায় বেসরকারি সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় বেওয়ারিশ হিসেবে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।

ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন জানান, নিবাসে এক জায়গায় বিভিন্ন বয়সী অনেক শিশু একসঙ্গে থাকে। ফলে হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ থেকে তাদের রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। তবে বর্তমানে সেখানে নতুন কোনো শিশু আক্রান্ত নেই এবং কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। সংক্রমণ প্রতিরোধে এখন নিবাসে নতুন কোনো শিশু এলেই তাকে শুরুতে আইসোলেশনে বা পৃথক রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

সম্ভাবনা থেকে সংকটে গণঅধিকার পরিষদ: রাজনীতির মাঠে টিকে থাকার লড়াই

নতুন ধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক কৌশলের…

5 minutes ago

মাস্টার্স পরীক্ষার আগেই বিচারক হলেন ইবির রাজু আহমেদ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের শিক্ষার্থী রাজু আহমেদ ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় ২৬তম…

5 minutes ago

শাল্লায় বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত

সুনামগঞ্জের শাল্লায় দেশে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিবাদে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও…

15 minutes ago

সিলেটে সওজের সরকারি জমিতে গোরস্থান নির্মাণের চেষ্টা, কাজ বন্ধ

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার পাঠানপাড়ায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের জমিতে দেয়াল তুলে গোরস্থান তৈরির চেষ্টা করা…

27 minutes ago

সরকারের অনুমোদন: দেড় লাখ টন সার ও মসুর ডাল কেনা হবে

দেশের বর্ধমান চাহিদা পূরণে সরকার ১ লাখ ৫৫ হাজার মেট্রিক টন সার এবং ১০ হাজার…

37 minutes ago

কাউকে ভয় পেতে আসিনি, আসিয়ান কাপ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হামজা চৌধুরী

প্রথমবার আয়োজিত ফিফা আসিয়ান কাপে অংশ নিতে জাকার্তায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ ফুটবল দল। দলে যোগ দিয়েছেন…

46 minutes ago

This website uses cookies.