Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

গুগল ম্যাপে এখন দেশের ৩৪ জেলার বায়ুর মান, যেভাবে দেখবেন

দেশের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে একটি নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে গুগল ম্যাপের মাধ্যমেই ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের ৩৪টি জেলার বায়ুর মান বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) সরাসরি দেখা যাবে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) কারিগরি ও তথ্য সহায়তায় এই সেবা চালু করা হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্ব নির্মল বায়ু দিবস। এই বিশেষ দিনেই বায়ুদূষণের তথ্য জানার এই সহজ উপায়ের কথা প্রকাশ করে ক্যাপস।

ব্যবহারকারীরা তাঁদের মুঠোফোনে গুগল ম্যাপ অ্যাপ্লিকেশনটি খুলে ‘লেয়ারস’ বা স্তরচিহ্নে চাপ দিয়ে ‘এয়ার কোয়ালিটি’ অপশনটি নির্বাচন করলেই মানচিত্রে বিভিন্ন এলাকার বায়ুমান দেখতে পাবেন। নির্দিষ্ট কোনো স্থানের ওপর চাপ দিলে সেখানকার বায়ুর মান কেমন, তা সংখ্যা ও রঙের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে। বায়ুমান সূচক বা একিউআই হচ্ছে বিভিন্ন দূষকের মাত্রাকে একটি সংখ্যার মাধ্যমে প্রকাশের পদ্ধতি, যা দেখে কোনো এলাকার বায়ু ভালো, মাঝারি, অস্বাস্থ্যকর নাকি ঝুঁকিপূর্ণ—সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

ক্যাপস জানিয়েছে, বায়ুর মান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের জন্য তারা দেশজুড়ে একটি পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ বা ৩৪টি জেলায় তাদের লাইভ মনিটরিং স্টেশন চালু হয়েছে। জেলাগুলো হলো—নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, ঢাকা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার। পর্যায়ক্রমে বাকি জেলাগুলোতেও স্টেশন বসিয়ে দেশের সব জেলাকে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

এই পর্যবেক্ষণ স্টেশনগুলো দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি পর্যবেক্ষণযন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর রয়েছে, যা দিয়ে তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম২.৫, বস্তুকণা পিএম১০, মোট উদ্বায়ী জৈব যৌগ (টিভিওসি), বায়ুমান সূচক এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। কোনো কোনো জেলার যন্ত্রে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড পরিমাপের ব্যবস্থাও রয়েছে। স্টেশনগুলো সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে এবং প্রতি ৫ মিনিট পর পর তথ্য পাঠায়। তবে গুগল বিভিন্ন উৎসের তথ্য সমন্বয় করে সাধারণত ঘণ্টাভিত্তিক বায়ুমান সূচক হিসাব ও প্রদর্শন করে।

গুগলের তথ্য অনুযায়ী, ম্যাপে প্রদর্শিত বায়ুর মান কেবল একটি স্টেশনের তথ্যের ওপর নির্ভর করে না। ভূমিতে থাকা পর্যবেক্ষণ স্টেশন ও বাণিজ্যিক সেন্সরের তথ্যের পাশাপাশি স্যাটেলাইট ডাটা, আবহাওয়ার ধরন, যানবাহনের চাপ, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমির আচ্ছাদনসংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করে বায়ুর মান নির্ধারণ করা হয়। ফলে গুগল ম্যাপে কোনো নির্দিষ্ট স্থানের একিউআই এবং নিকটবর্তী কোনো পর্যবেক্ষণ স্টেশনের সরাসরি পাঠের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। একটি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের তথ্য দিয়ে পুরো জেলার সব এলাকার বায়ুর মানও একই রকম বলে ধরে নেওয়া যায় না, কারণ বায়ুর মান অল্প দূরত্বের মধ্যেও বদলে যেতে পারে।

রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে পরিচিত। সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম থাকায় ঢাকায় বায়ুদূষণ অত্যধিক থাকে। তবে শুধু ঢাকা নয়, দেশের প্রতিটি শহরেই কমবেশি বায়ুদূষণ রয়েছে এবং তা এখন প্রায় সারা বছরই বজায় থাকে। যেমন, সম্প্রতি এক মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৯টায় বিশ্বের ১২৭টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ষষ্ঠ এবং বায়ুর মান ছিল ১৫৭, যা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। বর্ষা-পরবর্তী এই শরতেও বায়ুর মান ভালো থাকছে না।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা গুরুতর, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (ক্রিয়া) গবেষণায়। ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশে সূক্ষ্ম কণাদূষণের জনস্বাস্থ্য প্রভাব’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ড্যানিয়েল নেসান, হুবার্ট থিয়েরিও ও জেমি কেলি পরিচালিত এবং জোনাথন সাইডম্যান সম্পাদিত এই গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান পিএম২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু ঘটে। এসব মৃত্যুর বড় অংশই হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ফুসফুসের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেই বছরে প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ জনের মৃত্যু হয়।

ক্রিয়ার হিসাবে, পিএম২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে হাঁপানিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮২ বার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হয়। একই কারণে প্রতিবছর প্রায় ২৬ কোটি ৩০ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হয়। এছাড়া সূক্ষ্ম কণাদূষণের সঙ্গে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৪৮৫টি অপরিণত বা সময়ের আগে জন্ম এবং ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮৯টি কম ওজনের শিশুর জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলেছেন, বায়ুদূষণের এই ক্ষতিকর প্রভাব এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ছে। পিএম২.৫ বলতে বাতাসে ভাসমান ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের অতিক্ষুদ্র কণাকে বোঝায়, যা শ্বাসের সঙ্গে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে এবং রক্তপ্রবাহেও মিশে যেতে পারে।

ক্যাপসের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক (যিনি বর্তমানে অবসরোত্তর ছুটিতে বা পিআরএল-এ আছেন)। তিনি বলেন, গুগল ম্যাপের মাধ্যমে বায়ুদূষণের তথ্য আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং এতে সচেতনতা বাড়বে। তবে তিনি পর্যবেক্ষণযন্ত্রের মান ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সাধারণত তুলনামূলক কম দামের যন্ত্র দিয়ে এ ধরনের কাজ করা হয়, যা তিন থেকে চার বছর পর পর বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে। যন্ত্র নিয়মিত বদলানো, রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যালিব্রেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরের সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে ক্যাপসের ডাটা মিলিয়ে দেখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সাতটি ধাপ অনুসরণ করা প্রয়োজন। এগুলো হলো—তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ, দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, দূষণ বাড়া বা কমার কারণ অনুসন্ধান, নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য পদ্ধতি নির্ধারণ, সময় ও ব্যয়ের ভিত্তিতে পদ্ধতির তুলনামূলক ছক তৈরি এবং নির্বাচিত পদ্ধতি প্রয়োগের পাশাপাশি আইনের বাস্তবায়ন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের জেলা শহরগুলোয় বায়ুর মান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে দূষণের উৎস ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। ক্যাপস কয়েকটি সরকারি, বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বায়ুর মানের তথ্য নিয়ে থিসিস ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাবেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কনজ্যুমারস এসোশিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বিপিসির…

17 minutes ago

সৌন্দর্যের ভেতর ইতিহাসের শরীর: হেগেল ও মার্কসের নন্দনতত্ত্বের তুলনামূলক পাঠ

শিল্পের সত্য ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে হেগেল ও মার্কসের নন্দনতত্ত্বের ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ও তাদের দর্শনের তুলনামূলক…

46 minutes ago

আওয়ামী সন্ত্রাসীদের যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই প্রতিহত করা হবে: এস এম জিলানী

আওয়ামী লীগের নির্দেশে যারা অগ্নিসংযোগ ও বোমাবাজির মাধ্যমে দেশ অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে, তাদের কোনো…

52 minutes ago

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু…

55 minutes ago

বনশ্রীতে কুকুরকে খাওয়াতে গিয়ে তরুণীকে মারধর, থানায় অভিযোগ

রাজধানীর বনশ্রীতে পথকুকুরকে খাবার দিতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলার শিকার হয়েছেন এক তরুণী। গত মঙ্গলবার রাতে…

60 minutes ago

ঈশ্বরদীতে ক্রেতা সেজে দুই ভরি স্বর্ণের মালা নিয়ে চম্পট

পাবনার ঈশ্বরদীতে ক্রেতার পরিচয়ে দোকানে ঢুকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা মূল্যের দুই ভরি স্বর্ণের মালা…

1 hour ago

This website uses cookies.