Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

হাসিনাকাণ্ডে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন ক্ষত ও টানাপোড়েন

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই ভারত বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল। গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ঢাকায় এসে পারস্পরিক সম্পর্কে দূরত্ব কমানোর বার্তা দেওয়া—সব মিলিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির দ্বিচারিতায় দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দিল্লির মাটিতে তাকে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে ক্ষত তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে দীর্ঘকাল ধরেই নানা চড়াই-উতরাই ও আস্থার সংকট চলে আসছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছিল, তা যেন এখন স্থায়ী অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। এর মধ্যেই আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। কূটনৈতিক মহলে প্রত্যাশা ছিল এই আমন্ত্রণের মাধ্যমে দুই দেশের বরফ গলবে, কিন্তু ঠিক তার প্রাক্কালে দিল্লির মাটিতে বসে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন ও রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে গভীর উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভারত সরকার দেশটির সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছিল, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। চলতি বছরের শেষ নাগাদ তার দেশে ফেরার সাম্প্রতিক ঘোষণার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থান জানায় ভারত সরকার। এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, হাসিনার বিরুদ্ধে ঢাকার পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধটি প্রাসঙ্গিক আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করে দেখছে। একদিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না দেওয়ার ঘোষণা, অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলন করতে দেওয়ার এই দ্বিমুখী ভূমিকায় ঢাকা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছে, যা গত বুধবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে কড়া ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাকে প্রশ্রয় দেওয়ায় ভারতের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে দেশটির সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দিল, তা তার সরকারের বড় প্রশ্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারত তাকে আশ্রয় দিলেও সেখানে বসে তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বুধবার রাতের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পলাতক ও আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যার আসামি হাসিনা ও তার অনুচরেরা এই আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও দেশের জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে, এই অনুষ্ঠান আয়োজনের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে ভারত সরকারকে আগেভাগেই অবহিত করা হয়েছিল, এরপরও তা অনুষ্ঠিত হতে দেওয়ায় ঢাকা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ যখন জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে, সেদিনই ভারতের মাটিতে হাসিনার এই বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভারতের কোনো সাড়া মেলেনি।

এদিকে কড়া ভাষায় বিবৃতির মাধ্যমে দিল্লিকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে তারেক রহমান সরকার প্রশংসায় ভাসছে। অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতিকে সময়োপযোগী সাহসী প্রতিবাদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অনেকে লিখেছেন, ড. ইউনূসের সরকার যেভাবে ভারতের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছিল, তারেক রহমান সরকারও সেভাবে দেশের মর্যাদা সমুন্নত রেখেছে।

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারপারসন হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সম্মেলনে বিশেষ অতিথি বা আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। এটি তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের পক্ষ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় আনুষ্ঠানিক বহুপক্ষীয় আমন্ত্রণ। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর দুই দেশের জমে থাকা অবিশ্বাস দূর করার টার্নিং পয়েন্ট হতে পারত। তবে শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে আশকারা দেওয়া, পুশইন ও সীমান্ত হত্যার মতো ঘটনায় ঢাকার নীতিনির্ধারক মহলে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। দায়িত্বশীল সূত্র জানাচ্ছে, দিল্লির দ্বিচারিতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরক্ত। তিনি প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য ভারত বাদে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন এবং ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি মোদি সরকারের আচরণ পর্যবেক্ষণের ওপর রেখেছেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

সৌন্দর্যের ভেতর ইতিহাসের শরীর: হেগেল ও মার্কসের নন্দনতত্ত্বের তুলনামূলক পাঠ

শিল্পের সত্য ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে হেগেল ও মার্কসের নন্দনতত্ত্বের ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ও তাদের দর্শনের তুলনামূলক…

27 minutes ago

আওয়ামী সন্ত্রাসীদের যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই প্রতিহত করা হবে: এস এম জিলানী

আওয়ামী লীগের নির্দেশে যারা অগ্নিসংযোগ ও বোমাবাজির মাধ্যমে দেশ অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে, তাদের কোনো…

33 minutes ago

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু…

36 minutes ago

বনশ্রীতে কুকুরকে খাওয়াতে গিয়ে তরুণীকে মারধর, থানায় অভিযোগ

রাজধানীর বনশ্রীতে পথকুকুরকে খাবার দিতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলার শিকার হয়েছেন এক তরুণী। গত মঙ্গলবার রাতে…

41 minutes ago

ঈশ্বরদীতে ক্রেতা সেজে দুই ভরি স্বর্ণের মালা নিয়ে চম্পট

পাবনার ঈশ্বরদীতে ক্রেতার পরিচয়ে দোকানে ঢুকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা মূল্যের দুই ভরি স্বর্ণের মালা…

1 hour ago

গোপালগঞ্জে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মাঝে দুই লাখ টাকার অনুদানের…

1 hour ago

This website uses cookies.