Header Premium (728×90)

ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বম্বস’ হামলার ছক

ইরানের পরমাণু কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে নিজেদের সামরিক অস্ত্রাগারের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা ফেলার ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলে সি-১৩০ কার্গো বিমান থেকে ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা ‘সব বোমার মা’ হিসেবে পরিচিত এই শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হতে পারে। তবে মাটির গভীরে তৈরি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে এই বোমা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে খোদ ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই গভীর সংশয় ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সিএনএন ও আল-জাজিরার বরাতে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে এই বোমার সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম এবং তা চলমান সংঘাতকে আরও বড় পরিসরে উসকে দিতে পারে।

জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) নামের এই মারণাস্ত্রটির মোট ওজন ৯,৮০০ কেজি (২১,৬০৫ পাউন্ড বা প্রায় ১০ টন), যার মধ্যে সাড়ে ৮,০০০ কেজি (১৮,০০০ পাউন্ড বা সাড়ে ৮ টন) উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক রয়েছে। প্রায় ৩০ ফুট (৯ মিটারের বেশি) দীর্ঘ এবং একটি ছোট ইয়টের আকৃতির এই বোমাটি চারটি সাধারণ প্রাইভেট কারের সমান ভারী। বিশাল আকারের কারণে কৌশলগত স্টিলথ বোমারু বিমানে এটি আঁটে না, ফলে লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস কার্গো বা মালবাহী বিমান থেকে এটি ফেলা হয়। ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে নির্মিত এই বোমাটি এ পর্যন্ত ১২ বার পরীক্ষা করা হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে ‘ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স’ (আইএসকেপি)-এর সুড়ঙ্গ ও গুহা নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে মাত্র একবার এটি ব্যবহার করে, যাতে আফগান কর্তৃপক্ষের হিসাবে ৯৪ জন আইএস যোদ্ধা নিহত হয়। তবে স্থানীয় সূত্রে বেসামরিক লোকজনের হতাহত ও বাড়িঘর ধ্বংসের খবরও পাওয়া গিয়েছিল। বোমার এই নামের নেপথ্যে রয়েছে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের ব্যবহৃত ‘মাদার অব অল ব্যাটেলস’ বা ‘সব যুদ্ধের মা’ শব্দবন্ধটি।

বিশেষভাবে তৈরি এই এমওএবি বোমাটি মাটি স্পর্শ না করে ভূপৃষ্ঠ থেকে কয়েক ফুট ওপরে বিস্ফোরিত হয় এবং চারদিকে আগুনের মারাত্মক বিধ্বংসী শকওয়েভ ছড়িয়ে দেয়। সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল নিদাল আবু জাইদের মতে, মাটিতে আঘাত না করেই এর তীব্র বিস্ফোরণ ১ কিলোমিটার (দশমিক ৬ মাইল) ব্যাসার্ধের মধ্যের সবকিছু ধ্বংস করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হতে পারে খোলা মাঠে থাকা ইরানের স্থলবাহিনী বা পিকঅ্যাক্স মাউন্টের উপরিভাগের অবকাঠামো ধূলিসাৎ করা। তবে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশেষজ্ঞ এলিজাহ ম্যাগনিয়ার মনে করেন, পাহাড়ি শিলা বা গভীর কংক্রিট ভেদ করার সক্ষমতা এই বোমার নেই। ইরানের ফোরদো প্রকল্প এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে নির্মাণাধীন পারমাণবিক স্থাপনাগুলো মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত। মাটির ২০০ ফুট (৬১ মিটার) গভীর পর্যন্ত ভেদ করতে সক্ষম মার্কিন বাহিনীর শক্তিশালী ‘বাংকার বাস্টার’ জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (১৩,৬০০ কেজি বা ৩০,০০০ পাউন্ড), কিন্তু এমওএবি মূলত উন্মুক্ত স্থানে থাকা সৈন্য ও উপরিভাগের স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর।

ইরানের আকাশসীমায় সি-১৩০ বিমানের মতো বিশাল আকারের কার্গো বিমান পাঠানোর ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার কারণে এলিজাহ ম্যাগনিয়ার এই উদ্যোগকে একটি ‘রাজনৈতিক নাটক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ওয়াশিংটনের জন্য খুব সামান্যই রাজনৈতিক ফল আনবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অন্য অস্ত্র যা পারবে না, এই বোমা তা কী অর্জন করবে এবং কীভাবে তা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতাকে এগিয়ে নেবে। অন্যদিকে সিএনএন জানায়, ট্রাম্প ব্যক্তিগত আলোচনায় সংঘাতের একটি ‘চূড়ান্ত’ সমাপ্তি চাইছেন, যা ওয়াশিংটনের অপরাজিত থাকার প্রমাণ দেবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এমওএবি ব্যবহার করা হলে ইরানও বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণ চালাবে। এর জবাবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোতে আঘাত হানতে পারে তেহরান।

ইতিমধ্যেই সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করতে ইরান অস্ত্রের মজুত বৃদ্ধি, পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা কেন্দ্রগুলো সুরক্ষা এবং মিত্রদের সুসংগঠিত করছে। গত মে মাসে সংঘাতের সাময়িক বিরতির সময়ে কুয়েত অভিযোগ করে যে, আইআরজিসির নৌসেনারা তাদের বুবিয়ান দ্বীপে অনুপ্রবেশ করলে গোলাগুলিতে এক কুয়েতি আহত ও চার ইরানি সেনা বন্দী হন, যদিও ইরান একে নেভিগেশন ত্রুটি বলেছিল। সম্প্রতি আইআরজিসির নিরাপত্তা উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাগদি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ওয়াশিংটন স্থল হামলা চালালে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনাকে বন্দী করা হবে, যা তাদের সাদা পতাকা ওড়াতে বাধ্য করবে। পাশাপাশি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজাই টিভিতে দেওয়া বক্তব্যে হুমকি দেন, হামলা আবার শুরু হলে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ওই অঞ্চলের ডাটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সুবিধা এবং যোগাযোগ কেবলসহ নানা ডিজিটাল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরান পাল্টা আঘাত হানবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে কাজ করছে সরকার

সাভার সেনানিবাসে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক,…

5 minutes ago

এআইয়ের যুগে তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর নতুন কৌশল ও দিকনির্দেশনা

শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব দূরীকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে শ্রমবাজারে আসা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দক্ষতা…

22 minutes ago

পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

সাভারে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাই হবে আগামীর বাংলাদেশের…

25 minutes ago

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর তথ্যের নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা

হাসপাতালের ডিজিটাল ব্যবস্থায় রোগীর ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহারের…

28 minutes ago

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ১২০০

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি ও জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। দেশজুড়ে চলা…

40 minutes ago

কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর ৮ম প্রয়াণ দিবস: ‘রুপালি গিটার ফেলে’

বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর ৮ম প্রয়াণ দিবস আজ। ২০১৮ সালের এই দিনে মাত্র…

48 minutes ago

This website uses cookies.