যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে না জড়িয়ে, কম খরচে ও ভিন্ন উপায়ে চাপ সৃষ্টি করাই ইরানের ‘অসম যুদ্ধকৌশল’। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের একটি সামরিক ঘাঁটির কাছে সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার এবং ইসরাইলগামী একটি ফ্লাইদুবাই উড়োজাহাজের ককপিটে হামলার ঘটনার পর তেহরানের এই দীর্ঘদিনের কৌশলটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও এই দুই ঘটনায় ইরানের সরাসরি জড়িত থাকার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি, তবুও পশ্চিমা দেশগুলো এর পেছনে ইরানের পরোক্ষ ভূমিকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানের এই অসম যুদ্ধকৌশলের মূল লক্ষ্য কেবল সামরিক ক্ষতি করা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের মধ্যে ফাটল ধরানো। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের মতো পূর্ববর্তী মিত্রদের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে তেহরান এই কৌশলের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধেও তারা ড্রোনসহ বিভিন্ন অসম কৌশল ব্যবহার করেছিল, যা সময়ের সাথে সাথে আরও বিস্তৃত হয়েছে। ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল শেকারচি সম্প্রতি দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-তে এই কৌশলের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, অসম যুদ্ধ হলো শত্রুর ব্যয়বহুল ও ভারী অস্ত্রের মোকাবিলায় কম খরচের, সহজ কিন্তু কার্যকর সরঞ্জাম ব্যবহার করে বিজয় অর্জন করা।
এই কৌশলের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ড্রোন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা আঞ্চলিক দেশগুলোতে ইরান ব্যাপকভাবে ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা সরাসরি মার্কিন ভূখণ্ডে আঘাত না করেও ওয়াশিংটনের সামরিক উপস্থিতির ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে ছোট হামলাকারী নৌযান ও মাইন ব্যবহার করে জাহাজে হামলা চালানোর কৌশলও তেহরানের অন্যতম অস্ত্র। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবানন, ইয়েমেন, গাজা ও ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থি সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে হামলা চালিয়ে সরাসরি দায় এড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের একাধিক ফ্রন্টে চাপের মুখে রাখে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি প্রচলিত ও তীব্র যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতার সামনে টিকে থাকা ইরানের জন্য কঠিন। এ বিষয়ে দ্য সুফান সেন্টার তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছিল, তেহরান ভালো করেই জানে প্রচলিত যুদ্ধে ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। তাই তারা এমন এক দীর্ঘস্থায়ী পাল্টা কৌশল নিয়েছে যার লক্ষ্য কোনো চূড়ান্ত সামরিক জয় নয়, বরং টিকে থাকা ও নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখা।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে রাশিয়ার মদদপুষ্ট অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের সঙ্গে ইরানের এই পরোক্ষ কৌশলের মিল পাওয়া যায়। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির গবেষক ম্যাথিউ লেভিট গত বছর লিখেছিলেন, সরাসরি প্রতিশোধের ঝুঁকি এড়াতে ইরানের এজেন্টরা অপরাধী চক্রের সদস্যদের ভাড়া করে হামলা চালায়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ইরানের মদদপুষ্ট একটি ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ করে, যেখানে গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তি দাবি করেছিলেন যে নির্বাচনের আগে এক সরকারি কর্মকর্তা তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তবে ইরান এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে একে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জটিল করার ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছে।
যুক্তরাজ্যেও ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ব্রিটিশ অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর প্রধান জানান, তারা এক বছরে ইরানের মদদপুষ্ট ২০টিরও বেশি সম্ভাব্য প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করেছেন। ব্রিটেনের উপাসনালয় ও ইহুদিদের অ্যাম্বুলেন্সে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কিছু কিশোরসহ বেশ কয়েকজন অভিযুক্ত হয়েছে, যাদের অনেকেই সামান্য অর্থের বিনিময়ে এই কাজ করেছে এবং ইরানের সঙ্গে তাদের যোগসূত্রের বিষয়ে তারা প্রায় অজ্ঞ ছিল। এই বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য ‘ইসলামিক মুভমেন্ট অব দ্য কম্প্যানিয়নের অব দ্য রাইট’ (আইএমসিআর) নামক একটি গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করে, যারা বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের সিনাগগে হামলার দায় স্বীকার করেছিল এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দাবি এটি একটি ইরানি প্রক্সি।
তবে প্রমাণ ছাড়া সব অভিযোগ সত্য বলে ধরে নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি মিত্রদের ওপর চাপ তৈরির কৌশলের সঙ্গে মিললেও, ফ্লাইদুবাইয়ের ককপিটে হামলার ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞই সন্দিহান। তাদের মতে, এই মুহূর্তে ইসরাইলকে সরাসরি উসকে দিয়ে ইরানের কোনো কৌশলগত লাভ নেই। ফলে ইরানের এই অসম যুদ্ধকৌশলের দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও সাম্প্রতিক দুই ঘটনার সঙ্গে তেহরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭: ৪২আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭: ৪৭
পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব হারিয়েছেন সালমান আলি আগা। তার বদলে শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য উদীয়মান ওপেনার…
সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি ঠেকাতে লটারির মাধ্যমে পদায়ন কার্যক্রম শুরু করেছে আইন মন্ত্রণালয়। ঢাকা…
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরকে সামনে রেখে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রাপ্তি, প্রত্যাশা…
এলপিজির দাম সমন্বয়ে সরকার বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা.…
হেগভিত্তিক যুদ্ধাপরাধ আদালতের ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগ নিয়ে কসোভোর রাজধানী প্রিস্টিনায় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ব্যাপক…
রাজধানীর মিরপুরে অনুষ্ঠিত ক্লাব কাপ ওপেন তায়কোয়ানডো চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬-এ দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়েছে সাতক্ষীরা তায়কোয়ানডো ক্লাব।…
This website uses cookies.