Header Premium (728×90)

আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট নাজিবুল্লাহর উত্থান ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস

আফগানিস্তানের ইতিহাসে অন্যতম এক রক্তক্ষয়ী ও নির্মম অধ্যায় হয়ে আছে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর হত্যাকাণ্ড। একসময় পুরো দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই প্রভাবশালী নেতাকে জীবনের শেষ চারটি বছর কাটাতে হয়েছিল কাবুলের জাতিসংঘ মিশনের একটি সুরক্ষিত কম্পাউন্ডে। অবরুদ্ধ সেই জীবন থেকে তাঁর আর মুক্তি মেলেনি। ১৯৯৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে যখন তালেবান বাহিনী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখনই শেষ হয়ে যায় তাঁর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সেদিন রাতে জাতিসংঘ কম্পাউন্ডে জোরপূর্বক প্রবেশ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ ও তাঁর ভাই জেনারেল শাহপুর আহমাদজাইকে তুলে নিয়ে যায় তালেবান যোদ্ধারা। এর কয়েক ঘণ্টা পর কাবুলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আরিয়ানা চত্বরের একটি ট্রাফিক ল্যাম্পপোস্টে ঝুলতে দেখা যায় তাঁদের ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত মরদেহ।

মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর এই করুণ পরিণতি ছিল আফগানিস্তানের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। ১৯৪৭ সালে আফগানিস্তানের পাক্তিয়া প্রদেশের গারদেজ শহরে জন্ম নেওয়া এই পশতুন নেতার পুরো নাম ছিল মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ আহমাদজাই। তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে কাবুলের হাবিবিয়া হাইস্কুলে এবং ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের বারামুল্লার সেন্ট জোসেফস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে। সেখান থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি দেশে ফিরে ১৯৬৪ সালে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করলেও কখনো চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই ১৯৬৫ সালে নাজিবুল্লাহ আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট রাজনৈতিক দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তানে (পিডিপিএ) যোগ দেন। আদর্শিক দ্বন্দ্বে দলটি যখন ‘পারচাম’ ও ‘খালক’—এই দুটি উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন তিনি পারচাম গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা বাবরাক কারমালের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী ও ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার কারণে ছাত্রজীবনেই তাঁকে দুবার কারাগারে যেতে হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পিডিপিএর খালকপন্থীরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করলে দেশজুড়ে অস্থিরতা ও সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে বিপুল সৈন্য পাঠায় এবং খালকপন্থী সরকারকে হটিয়ে নিজেদের বিশ্বস্ত পারচামপন্থী বাবরাক কারমালকে ক্ষমতায় বসায়।

বাবরাক কারমালের আমলে নাজিবুল্লাহর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে উল্কার গতিতে। ১৯৮০ সালে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমকে ঢেলে সাজানোর উদ্দেশ্যে নাজিবুল্লাহকে গোয়েন্দা সংস্থা ‘খাদ’-এর প্রধান করা হয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বে ‘খাদ’ হয়ে ওঠে আফগানিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ও নিষ্ঠুরতম গোয়েন্দা সংস্থা। সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির আদলে গড়ে ওঠা এই সংস্থায় নিয়মিত কর্মীর সংখ্যা একপর্যায়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজারে পৌঁছায়। কমিউনিস্ট সরকার ও সোভিয়েত সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে সোচ্চার মুজাহিদিন যোদ্ধা ও সাধারণ আফগানদের কঠোর হস্তে দমন করতে দেশজুড়ে ব্যাপক নজরদারি, গোপন বন্দিশালায় নির্যাতন ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালায় এই সংস্থা। এই চরম দমন-পীড়নের কারণে বিরোধীদের কাছে নাজিবুল্লাহ ‘কাবুলের কসাই’ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেন।

১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতায় আসার পর আফগান নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। গর্বাচেভ আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পথ খুঁজছিলেন এবং তিনি মনে করেছিলেন অকার্যকর বাবরাক কারমালকে ক্ষমতায় রেখে মুজাহিদিনদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। ফলে কেজিবির চাপে ১৯৮৬ সালে কারমাল পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং প্রথমে পিডিপিএর সাধারণ সম্পাদক ও পরে ১৯৮৭ সালে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ। ক্ষমতায় এসে নাজিবুল্লাহ নিজেকে একজন সমঝোতাকামী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি জাতীয় আপস কমিশন গঠন করেন, ছয় মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন এবং ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সুযোগ রেখে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন। দেশের নামও পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রিপাবলিক অব আফগানিস্তান’।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সব সেনা প্রত্যাহার করে নিলেও পরাশক্তিটির পাঠানো বিপুল অর্থ ও সামরিক সহায়তার ওপর ভর করে নাজিবুল্লাহ মুজাহিদিনদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের আকস্মিক পতনের পর নাজিবুল্লাহর ক্ষমতার মূল ভিত্তি ভেঙে পড়ে। ১৯৯২ সালে মুজাহিদিনদের তীব্র আক্রমণের মুখে তাঁর সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন জাতিসংঘের বিশেষ দূত বেনন সেভানের মধ্যস্থতায় নাজিবুল্লাহকে নিরাপদে ভারতে পাঠানোর একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী ফাতানা নাজিবুল্লাহ এবং তিন কন্যা আগেই ভারতের নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাও সরকারও তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে সম্মত হয়েছিল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৯২ সালের ১৭ এপ্রিল নাজিবুল্লাহ তাঁর ভাই জেনারেল আহমাদজাইকে নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কাবুল বিমানবন্দরের দিকে রওনা হন, যেখানে জাতিসংঘের একটি চার্টার্ড বিমান তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু বিমানবন্দরটি ততক্ষণে নাজিবুল্লাহর অবাধ্য জেনারেল রশিদ দোস্তামের উজবেক মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। তারা বিমানবন্দরে নাজিবুল্লাহর গাড়ি আটকে দেয়। বাধ্য হয়ে নাজিবুল্লাহ গাড়ি ঘুরিয়ে কাবুলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনে আশ্রয় নেন। এর পরদিনই মুজাহিদিনরা আনুষ্ঠানিকভাবে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সুরক্ষার কারণে মুজাহিদিন সরকার নাজিবুল্লাহর ওপর সরাসরি হামলা করতে না পারলেও তাঁকে মুক্ত করার বা ভারতে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। ফলে দীর্ঘ চার বছর তাঁকে জাতিসংঘের কম্পাউন্ডেই বন্দীর মতো কাটাতে হয়।

নাজিবুল্লাহর পতনের পর আফগানিস্তানে শান্তি ফিরে আসার পরিবর্তে মুজাহিদিন দলগুলো ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়। বুরহানুদ্দিন রব্বানি, আহমেদ শাহ মাসুদ ও গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের মতো প্রভাবশালী মুজাহিদিন নেতাদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রাজধানী কাবুল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং হাজারো সাধারণ মানুষ নিহত হন। এই চরম অরাজকতার মধ্যে ১৯৯৪ সালে মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের নেতৃত্বে কান্দাহারে তালেবান নামক এক নতুন শক্তির উদয় হয়। কঠোর ইসলামি শরিয়া আইন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা দ্রুত সাধারণ মানুষের সমর্থন লাভ করে এবং ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

১৯৯৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে তালেবানের অগ্রযাত্রার মুখে কাবুলের প্রতিরক্ষায় থাকা সরকারি ও মুজাহিদিন বাহিনী শহর থেকে পিছু হটতে শুরু করে। ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে কার্যত কোনো বড় প্রতিরোধ ছাড়াই তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সরাসরি হানা দেয় জাতিসংঘের কম্পাউন্ডে। সেখান থেকে নাজিবুল্লাহ ও তাঁর ভাই জেনারেল শাহপুর আহমাদজাইকে তুলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করার পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তাঁদের মরদেহ একটি ট্রাকের পেছনে বেঁধে পুরো কাবুল শহরের রাস্তায় ঘোরানোর পর আরিয়ানা চত্বরে প্রেসিডেন্ট ভবনের ঠিক বাইরের একটি ট্রাফিক ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পরদিন, ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায় এবং পরবর্তী সময়ে সাধারণ পরিষদ দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানায়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে ব্রুনাইয়ের হাইকমিশনারের বৈঠক

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রুনাইয়ের…

2 minutes ago

শিশু নাফিস অপহরণ মামলার আসামির শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ১১ মাস বয়সী শিশু নাফিসকে অপহরণ ও পাচারের মূলহোতা আবুল কালাম আজাদের দৃষ্টান্তমূলক…

12 minutes ago

তিন দিনে ১১৯ কোটি রুপি আয় করে রেকর্ড গড়ল ‘দ্য প্যারাডাইস’

অতিরিক্ত নৃশংসতার অভিযোগ থাকলেও বক্স অফিসে দারুণ সাড়া ফেলেছে দক্ষিণী তারকা নানির নতুন সিনেমা 'দ্য…

13 minutes ago

দেশে ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরও নয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই…

22 minutes ago

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা: জমি নিয়ে বিবাদের ইঙ্গিত পুলিশের

রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জমি…

23 minutes ago

সুনামগঞ্জের শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হলেন এমদাদুল হক

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে মাধ্যমিক পর্যায়ে সুনামগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন দোয়ারাবাজার…

26 minutes ago

This website uses cookies.