Header Premium (728×90)

লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ: ঝুঁকিতে সৌদির বিকল্প তেল রপ্তানি পথ

২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর (12 September 2026) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। তাদের এই অগ্রযাত্রা এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশমুখ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গত বৃহস্পতিবার বন্দরনগরী মোকা দখল করার মাধ্যমে গোষ্ঠীটি সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের ওপর বড় ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এটি অন্যতম বড় পরিবর্তন। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপর। কারণ, ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে সৌদি তেল পরিবহনে বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরপথের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে হুথিরা সৌদি পতাকাবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণাও দিয়েছে। ফলে ইয়েমেন উপকূল ও বাব আল-মান্দেবে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হবে।

ইয়েমেনে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৪ সালে, যখন হুথি যোদ্ধারা রাজধানী সানা ও বন্দরনগরী হুদাইদাহ দখল করে তৎকালীন সরকারকে হটিয়ে দেয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষে এবং ইরানের প্রভাব রুখতে সরাসরি যুদ্ধে নামে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় সামরিক জোট। বর্তমানে ইয়েমেন সরকারের প্রধান ঘাঁটি এডেনে অবস্থিত। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ চলছিল। তবে গত সপ্তাহে শুরু হওয়া তীব্র লড়াইকে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হিসেবে দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। এবার হুথিদের মূল লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগরের উপকূলভাগ দখল করা এবং সরকারি বাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধ ভেঙে তারা একের পর এক এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

বাব আল-মান্দেব প্রণালিটি সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ যেত হরমুজ প্রণালি দিয়ে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান সেই পথ বন্ধ করে দেওয়ার পর বাব আল-মান্দেবের ওপর আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়া কেবল সামরিক সাফল্যই নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগও এনে দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব তার ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের ব্যবহার বৃদ্ধি করে। ১৯৮০-এর দশকে আপৎকালীন বিকল্প হিসেবে নির্মিত এই পাইপলাইনটি আবকাইক তেলক্ষেত্র থেকে শুরু হয়ে আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে। ২০১৯ সালে হুথিদের ড্রোন হামলার পর এটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও চলমান সংকটে সৌদি আরব এর সক্ষমতা দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল পরিবহন ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু এখন পুরো উপকূল হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় এই বিকল্প পথটিও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যে শুক্রবার ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের একটি অংশ থেকে ধোঁয়া ওড়ার ছবি প্রকাশ পেয়েছে এবং হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি তেলের ট্যাংকারকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তবে পাইপলাইনে হামলা হয়েছে কি না, তা সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।

হুথিদের এই অগ্রযাত্রার ফলে সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে তেহরান। বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলে দিচ্ছে, যা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে তেহরানের দরকষাকষির শক্তি বাড়াবে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সেখানে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এখন বাব আল-মান্দেবে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ যুক্ত হওয়ায় ইরানের প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আলাম সালেহ মনে করেন, এর মাধ্যমে ইরানের হাতে হরমুজের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে।

এই সংকটের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়তে পারে। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে, যা চলমান যুদ্ধকে মার্কিন ভোটারদের কাছে আরও অজনপ্রিয় করে তুলবে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব রিপাবলিকানদের ওপর পড়তে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও চলতি সপ্তাহে মন্তব্য করেছেন যে, নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। অধ্যাপক আলাম সালেহের মতে, ওয়াশিংটন ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে চাইলেও পরিস্থিতি অনুকূলে রাখার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পাশাপাশি হুথিদের এই সাফল্য চীন ও রাশিয়ার কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক আধিপত্য আগের চেয়ে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাত্র কল্যাণ পরিষদের নবীনবরণ ও বিদায়

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্র কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে নবীনবরণ ও প্রবীণ বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।…

13 seconds ago

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং দমনে একরাতে ৬২৪ জন আটক

কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬২৪ জনকে আটক…

8 minutes ago

বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থার আওতায় বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গঠিত বিদ্যমান…

27 minutes ago

দেশের বাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ভরিতে ১ হাজার ৬৯১ টাকা বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।…

36 minutes ago

বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে বড় পতন

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে রাখবে—এমন আশঙ্কায় বুধবার আন্তর্জাতিক…

1 hour ago

এআই-এর যুগেও নিজের অবস্থানে অনড় ‘লিপস্টিক কিং’ লি জিয়াকি

চীনের লাইভস্ট্রিম শপিং খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের মুখেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন সুপারস্টার লি…

1 hour ago

This website uses cookies.