দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা, ঔপন্যাসিক ও চিত্রনাট্যকার লি চ্যাং-দংয়ের সিনেমায় পৃথিবী কখনোই মানুষের জন্য সহজ কোনো স্থান নয়। তার প্রতিটি সৃষ্টিতে মানুষ এমন সব আকস্মিক ঘটনার মুখোমুখি হয়, যার জন্য সে আগে থেকে প্রস্তুত ছিল না। এরপর এক অন্ধকার ও অস্পষ্ট জগতের মাঝে তাকে নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে নিতে হয়। সম্প্রতি মেট্রোগ্রাফে তার চলচ্চিত্রের রেট্রোস্পেকটিভ উপলক্ষে লেখক ফিবি চেনের সঙ্গে এক ই-মেইল সাক্ষাৎকারে নিজের সিনেমা, সাহিত্যচর্চা, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, ইতিহাস এবং জীবনের নানা দর্শন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই গুণী নির্মাতা।
১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া লি চ্যাং-দং দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব। কিয়ংপুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কোরীয় ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৮৩ সালে উপন্যাসের মাধ্যমে তার সাহিত্যিক জীবন শুরু হলেও পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯৯৭ সালে ‘গ্রিন ফিশ’ ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর একে একে নির্মাণ করেন ‘পেপারমিন্ট ক্যান্ডি’, ‘ওয়েসিস’, ‘সিক্রেট সানশাইন’, ‘পোয়েট্রি’ এবং ‘বার্নিং’-এর মতো বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্র। ২০০২ সালে ‘ওয়েসিস’ ছবির জন্য ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালক এবং ২০১০ সালে ‘পোয়েট্রি’র জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া ২০১৮ সালে তার ‘বার্নিং’ ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপ্রেস্কি পুরস্কার জেতার পাশাপাশি অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে শর্টলিস্ট হওয়া প্রথম কোরিয়ান চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাস গড়ে। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি ২০০৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার culture ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
লি চ্যাং-দংয়ের চলচ্চিত্রগুলো কেবল হতাশার গল্প বলে না, বরং চরম অন্ধকারের মধ্যেও বেঁচে থাকার এক সূক্ষ্ম আলো দেখায়। যেমন ‘পোয়েট্রি’ ছবিতে মি-জা নামের এক নারী জানতে পারে তার ১৬ বছরের নাতি এক স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যার সাথে জড়িত। ‘সিক্রেট সানশাইন’ ছবিতে স্বামীহারা এক নারী নতুন শহরে এসে তার সন্তানকেও হারায়। আবার ‘বার্নিং’ ছবিতে ব্যক্তিগত জীবনের অনিশ্চয়তার পেছনে উঁকি দেয় সামাজিক শ্রেণী, অর্থনীতি ও ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামো। অন্যদিকে ‘পেপারমিন্ট ক্যান্ডি’ ছবিতে একজন মানুষের জীবনের গল্পকে উল্টো দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসের ক্ষতগুলোর কাছে—যার মধ্যে রয়েছে ১৯৯০-এর দশকের আইএমএফ সংকট থেকে শুরু করে ১৯৮০ সালের গওয়াংজু অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত দমনের ইতিহাস। এই গভীর অন্ধকারের মধ্যেও কখনো বাতাসে গাছের পাতা কেঁপে ওঠে, নদীর ধারে ফুল ফোটে কিংবা সন্ধ্যার আলো এসে পড়ে। মানুষ তখন তার যন্ত্রণার সাথে বেঁচে থাকার জন্য ধর্ম, কবিতা বা কল্পনার মতো কোনো পথ খুঁজে নেয়।
সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের পার্থক্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লি চ্যাং-দং জানান, চলচ্চিত্র পর্দায় সময় ও গতিকে দৃশ্যমান করতে পারে, যা সাহিত্যের পক্ষে সম্ভব নয়। ‘পেপারমিন্ট ক্যান্ডি’র মতো সময়ের উল্টো দিকে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যে ফুটিয়ে তোলা কঠিন। শুটিংয়ের সময় তিনি সবসময় এমন কিছু সিনেমাটিক মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকেন, যা আগে থেকে পরিকল্পনা করা যায় না। যেমন হঠাৎ বাতাসে গাছ কেঁপে ওঠা, মেঘের ফাঁক দিয়ে আলো আসা কিংবা অভিনেতার মুখে সূক্ষ্ম কোনো অভিব্যক্তি ফুটে ওঠা। ‘পেপারমিন্ট ক্যান্ডি’র উল্টো সময়ের কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, ফলাফলটি আগে দেখে পেছনের দিকে তাকালে জীবনের ভয়াবহ বিদ্রূপগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাচীন গ্রিক ধারণার ‘ক্রোনোস’ (মিনিট-সেকেন্ডে বিভক্ত সময়) এবং ‘কাইরোস’ (মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফিরে তাকানোর সময়)—এই দুইয়ের মধ্যে ‘পেপারমিন্ট ক্যান্ডি’ মূলত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফেলে আসা সময়ের দিকে তাকানোর গল্প। এটি দেখায় যে মানুষের প্রতিটি সিদ্ধান্তের অর্থ কতটা গভীর ও ভয়াবহ হতে পারে, যা ব্যক্তি ও দেশের ইতিহাস উভয় ক্ষেত্রেই সত্য।
গল্পের কাঠামো ও আকস্মিকতা নিয়ে এই নির্মাতা জানান, প্রায় পুরো প্লট চিত্রনাট্যের পর্যায়েই চূড়ান্ত হয়ে যায়। তবে তার কাছে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো গল্পের ভেতরের প্রয়োজনীয়তা খুঁজে বের করা। তিনি মনে করেন, জীবন যেমন অসংখ্য আকস্মিকতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সিনেমাকেও সেই সত্যটি ধারণ করতে হয়। কেবল যান্ত্রিক কারণ ও ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ছবি বানালে তা হালকা হয়ে যায়। ‘গ্রিন ফিশ’ ছবিতে ট্রেনে পড়ে থাকা স্কার্ফ কিংবা ‘বার্নিং’ ছবিতে জং-সু ও হে-মির দেখা হওয়া—এমন সব আকস্মিক ঘটনার মাধ্যমেই গল্প শুরু হয়। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো কাকতালীয় মনে হলেও পরে তা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
বাস্তব জীবনের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশে শিল্পের ভূমিকা নিয়ে লি চ্যাং-দংয়ের অভিমত হলো, শিল্প মানুষের রাগ ও হতাশাকে প্রকাশ করতে পারে, তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সন্ত্রাস, পুঁজির অত্যাচার বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সিনেমায় উঠে আসলেও অনেক সময় তা কেবল বিনোদন বা দর্শকের সাময়িক আবেগ প্রশমনের উপাদান হয়ে দাঁড়ায়, যা মানুষের আত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, লেখক হিসেবে তিনি সবসময় লেখার অর্থ খুঁজতেন, কিন্তু চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সাফল্য বা বিনোদনের চাহিদার কারণে অতিরিক্ত অর্থ খুঁজতে যাওয়া কখনো কখনো নির্মাণ প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তোলে।
সীমাবদ্ধতার মধ্যে চরিত্রের স্বাধীনতা নিয়ে লি চ্যাং-দং বলেন, তার চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো দুর্বল হলেও তারা পরম শক্তির বিরুদ্ধে বেপরোয়া লড়াই করে। ‘পোয়েট্রি’ ও ‘ওয়েসিস’-এ তারা লড়াই করে সমাজের নৈতিক অসাড়তা ও ভণ্ড মতাদর্শের বিরুদ্ধে, ‘বার্নিং’-এ রহস্যময় পৃথিবীর বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং ‘সিক্রেট সানশাইন’-এ স্রষ্টার বিরুদ্ধে। এই লড়াইয়ের মাধ্যমেই তারা নিজেদের স্বাধীনতা ও পরিচয় খুঁজে পায়। অভিনেতাদের পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তার নিজস্ব দর্শন রয়েছে। তিনি অভিনেতাদের সরাসরি ‘অভিনয় না করে’ চরিত্রটি হয়ে ওঠার পরামর্শ দেন। পরিচালক হিসেবে তিনি অভিনেতাদের ‘দরজার হাতল’ খুঁজে পেতে সাহায্য করেন, যাতে তারা নিজেই সেই দরজাটি খুলতে পারেন।
সাধারণত ছবি শেষ করার পর নিজের কাজ আর দেখেন না লি চ্যাং-দং। তবে সম্প্রতি রিমাস্টারিং প্রকল্পের কারণে অনেক বছর পর আবার নিজের পুরোনো ছবিগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে তার। এই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, চলচ্চিত্র আমাদের অন্য একজনের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে শেখায়। নিজের পুরোনো ছবিগুলো দেখে তার মনে হয়েছে তিনি যেন ১০ বা ২০ বছর আগের নিজের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখছেন। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষ হিসেবে নিজের অবচেতন ও গভীর পরিবর্তনগুলো আবিষ্কার করা তার কাছে এক অদ্ভুত ও অনন্য অভিজ্ঞতা ছিল।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা…
জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। এই আলোচনার পর…
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন…
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন…
ডেঙ্গু ও হামে মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম…
নিউইয়র্কে আয়োজিত জাতিসংঘের এক বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক…
This website uses cookies.