মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের সরকারি স্কুল ও কলেজগুলোতে এখনো আইসিটি শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদ সৃষ্টি না হওয়া এবং নিয়োগে সমন্বয়ের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান বা ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষকেরা এই বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের চেয়ে কেবল পরীক্ষামুখী পড়ালেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর আইসিটি শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি কমানো কঠিন হবে। এমন সময়ে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যখন ডিজিটাল অগ্রগতির আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর আলোকে ২০১৩ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটি বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও শিক্ষক পদ সৃষ্টি ছাড়াই বিষয়টি চালু করার কারণে শুরু থেকেই এই সংকট তৈরি হয়। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি হলেও ৩ হাজারের বেশি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদও খালি। এর মধ্যেই আইসিটি বাধ্যতামূলক হওয়ার ১৩ বছর পরও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বিষয়ের একটি আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের শিক্ষকেরা প্রশিক্ষণ নিয়ে কোনোমতে আইসিটির ক্লাস নিচ্ছেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল এ বিষয়ে জানান, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি কলেজে আইসিটিসহ বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকের সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য মাউশি থেকে চাহিদা ও পদের হিসাব অনুযায়ী প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় সেটি সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠিয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এই সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করছেন তিনি। তবে মাউশির প্রস্তাব অনেক সময় মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। সম্প্রতি মাউশি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৮৭২টি আইসিটি শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে এক শিফটের ৫৩২টি বিদ্যালয়ে একটি করে এবং দুই শিফটের ১৭০টি বিদ্যালয়ে দুটি করে পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
সরকারি কলেজগুলোর চিত্রও সন্তোষজনক নয়। দেশে বর্তমানে ৭০৮টি সরকারি কলেজ রয়েছে, যার মধ্যে ৬৯১টিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদান করা হয়। ২০০০ সাল পর্যন্ত সরকারি হওয়া পুরোনো ৩৪৫টি কলেজের মধ্যে ৬৫টিতে এখনো আইসিটি বিষয়ের পদ সৃষ্টি হয়নি, তবে ১৭টিতে কম্পিউটার শিক্ষার প্রভাষক পদ রয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের বিধিমালার আওতায় সরকারি হওয়া ৩৬৩টি কলেজের মধ্যে ১০২টিতে আইসিটি বিষয়ের কোনো পদ নেই। প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ডিগ্রি ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে প্রতিটি বিষয়ে অন্তত একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক ও দুজন প্রভাষকের পদ থাকার কথা থাকলেও আইসিটির ক্ষেত্রে অধিকাংশ কলেজে এই কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
আইসিটি বাধ্যতামূলক হওয়ার দীর্ঘ আট বছর পর ২০২১ সালে ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ১৪৫ জন আইসিটি প্রভাষক সরকারি কলেজে যোগ দেন। বর্তমানে তাঁদের মধ্যে ১৩২ জন কর্মরত আছেন। পরবর্তীতে ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে মোট ১০৩ জন আইসিটি প্রভাষককে পিএসসি সুপারিশ করলেও তাঁদের যোগদান এখনো সম্পন্ন হয়নি। এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক প্রথম বর্ষেও আইসিটি বাধ্যতামূলক করেছে, যা বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দিয়ে চালানো হচ্ছে।
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী থাকলেও সেখানে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কোনো আইসিটি শিক্ষক নেই। পদার্থবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যার শিক্ষকেরা সেখানে আইসিটির ক্লাস নেন। এছাড়া একটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া দুজন কম্পিউটার প্রোগ্রামারকে বেসরকারি তহবিল থেকে বেতন দিয়ে পাঠদানে যুক্ত রাখা হয়েছে। কলেজটির আইসিটি বিভাগের দায়িত্বে থাকা পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল হাসনাত মাসুম ইকবাল জানান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী এখানে অন্তত দুজন নিজস্ব আইসিটি শিক্ষক প্রয়োজন। একই অবস্থা মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়েও, যেখানে ভৌতবিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষকেরা আইসিটি পড়ান।
ঢাকার বাইরে নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য সরকারিভাবে মাত্র একজন আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন। কলেজটির অধ্যক্ষ মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, একজন শিক্ষকের পক্ষে এত শিক্ষার্থীর নিয়মিত ক্লাস নেওয়া অসম্ভব হওয়ায় একজন অতিথি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে। নেত্রকোনা সরকারি কলেজেও ২ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে সরকারি আইসিটি শিক্ষক মাত্র একজন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যোগ্য প্রার্থীর অভাব না থাকলেও সংকটটি মূলত পদ সৃষ্টি, নিয়মিত নিয়োগ ও পদোন্নতির কাঠামোর অভাবে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। সরকারি কলেজে আইসিটি শিক্ষকদের পদোন্নতির পথও বেশ রুদ্ধ। ৫১টি সরকারি কলেজে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত ২৯১টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। ফলে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করলেও অনেক শিক্ষক উচ্চতর পদে যেতে পারছেন না। অথচ সর্বশেষ ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে আইসিটি প্রভাষকের মাত্র ২৫টি পদের বিপরীতে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ জন আবেদন করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সময়ের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এবং সেই অনুযায়ী আইসিটি বইও পরিমার্জন করা হয়েছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে যদি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকেন, তবে এই পরিবর্তনগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। এ জন্য বিদ্যালয় ও কলেজে দ্রুত আইসিটি-সংশ্লিষ্ট শিক্ষকসংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি অর্থনীতি পুনর্গঠনে সরকার কাজ…
প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ ইস্যুতে চলমান গুঞ্জন নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন,…
নাইজেরিয়ার বেনিন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়েছে এনুগু এয়ারের একটি যাত্রীবাহী বিমান। বৃহস্পতিবার…
কিশোর-কিশোরীদের জন্য সহজলভ্য ও যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেলকে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায়…
সরকারের ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনে নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার…
টানা বৃষ্টি ও বন্যায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানীর বাজারে পেঁয়াজ, ডিম, মুরগি ও সবজির দাম…
This website uses cookies.