Header Premium (728×90)

চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা তৈরি করবে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়: ড. ইউনূস

তরুণদের চাকরি খোঁজার জন্য কোনো কাগজ বা ডিপ্লোমা দেবে না গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়। বরং এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠবে এবং চাকরির স্রষ্টা হবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেডের ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যাটফর্ম ‘জিপে’-এর আনুষ্ঠানিক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ড. ইউনূস বলেন, ‘থ্রি জিরো’ পরিকল্পনা নিয়ে কিছুদিন পর ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। এই ‘থ্রি জিরো’র মধ্যে রয়েছে—জিরো নেট কার্বন এমিশন, জিরো ওয়েলথ কনসেন্ট্রেশন ও জিরো আনএমপ্লয়মেন্ট। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এর মূলমন্ত্র হবে—‘আমরা উদ্যোক্তা, চাকরির প্রার্থী নই; চাকরির স্রষ্টা’। শিক্ষার্থীরা এখানে থাকতেই নতুন ব্যবসা সৃষ্টি করবে এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে সমাজের সমস্যার সমাধান করবে।

অনুষ্ঠানে গ্রামীণ ব্যাংকের শুরুর দিকের কথা স্মরণ করে ড. ইউনূস জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে তিনি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় যেতেন এবং সবার সঙ্গে দেখা করতেন। তিনি বলেন, ব্যাংকের শুরু থেকেই প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল, যাতে বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করা যায়। গ্রামীণই প্রথম ব্যাংক, যা কম্পিউটারকে গ্রামের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল। তখন বিদ্যুৎ না থাকলেও জেনারেটর চালিয়ে কম্পিউটার বসিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। তিনি আরও বলেন, ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না, বিদ্যুৎ বা পুলিশ স্টেশনও ছিল না। এক শাখার সঙ্গে অন্য শাখার যোগাযোগেও সমস্যা হতো। এ কারণে বিভিন্ন উপায়ে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার একটি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যরা এখন মোবাইল ফোনেই সব কাজ করতে পারছেন।

গ্রামীণফোনের শুরুর যাত্রার কথাও স্মরণ করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, গ্রামীণফোনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আজকের অনুষ্ঠানের মতোই উচ্চপর্যায়ে হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এবং গ্রামের একজন গ্রামীণ ব্যাংকের নারী একসঙ্গে কথা বলেছিলেন। এটি ছিল প্রথম এমন উৎসব, যেখানে টেলিফোনের শক্তি ও আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি দেখানো হয়েছিল, যা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত ছিল। তিনি জানান, গ্রামীণফোনের একটি লক্ষ্য ছিল গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো, বিশেষ করে দরিদ্র নারীদের কাছে। তখন অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, গ্রামের নারী ফোন দিয়ে কী করবে? সে তো নম্বরই চেনে না। ড. ইউনূস বহুবার ব্যাখ্যা করেছেন যে, পৃথিবীতে নম্বর মাত্র ১০টি, যা শেখা সম্ভব। এই ১০টি সংখ্যা চেনার কারণে যদি রোজগার করা যায়, তাহলে এগুলো শিখতে ১০ মিনিটও সময় লাগবে না। সেই প্রচেষ্টায় গ্রামের দরিদ্র নারীদের হাতে ফোন তুলে দেওয়া হয়, যার ফলে গ্রাম-গঞ্জের মানুষের সঙ্গে ফোনের সংযুক্তি তৈরি হয় এবং যে নারীর কাছে ফোন গিয়েছিল, তিনি ক্রমাগতভাবে উপার্জন করতে থাকেন। শুরুতে অনেকেই ধারণা করেছিল এই কোম্পানি লাভ করবে না, কিন্তু গরিব মানুষের হাতে শুরু হওয়া সেই কোম্পানি অত্যন্ত সফল একটি কোম্পানি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। গ্রামীণফোনকে কেন্দ্র করে বহু কোম্পানি শহরের বাইরে তাদের ব্যবসা নিয়ে যায় এবং গ্রামের গরিব মানুষের হাত দিয়েই তাদের ব্যবসা গড়ে তোলে।

জিপে প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, জিপে-এর লক্ষ্য হলো মানুষকে ভয় থেকে মুক্তি দেওয়া। এখন আর টাকা বহন করার চিন্তা থাকবে না। এটি একটি বড় পরিত্রাণ। তিনি বলেন, বড়লোকের জন্য অনেক আয়োজন থাকে, কিন্তু গরিবের জন্য তা নেই। গরিব মানুষের জন্য যেন প্রযুক্তির সার্ভিস থাকে, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। জিপে-এর মাধ্যমে সেটিই করার চেষ্টা চলছে।

গ্রামীণ আমেরিকার সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ধারণা নিয়ে ২০০৮ সালে শুরু হওয়া গ্রামীণ আমেরিকা এখন প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ দিচ্ছে তাদের সদস্যদের, যার রিপেমেন্ট রেট ৯৯ শতাংশ। গ্রামীণ আমেরিকার কাছ থেকে প্রযুক্তির ব্যবহার শেখা হয়েছে এবং সেটি এখানে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে।

ড. ইউনূস জোর দিয়ে বলেন, ‘গ্রামীণের সব ব্যবসাই সামাজিক ব্যবসা’। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সামাজিক ব্যবসা হলো এমন একটি ব্যবসা, যেখানে মালিক কোনো ব্যক্তিগত মুনাফা বা লভ্যাংশ নেন না। এ ব্যবসার মূল লক্ষ্য সমাজের সমস্যার সমাধান করা। তিনি আরও বলেন, জিপে একটি সামাজিক ব্যবসা। এখানে মুনাফা কোনো ব্যক্তি নেবেন না। কোম্পানি যা লাভ করবে, তা দিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করবে। সামাজিক ব্যবসার মধ্যেই তা সম্প্রসারিত হবে। গ্রামীণ সামাজিক ব্যবসা করে বলেই এর এত প্রতিষ্ঠান হয়েছে। মুনাফা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে না দিয়ে তা দিয়ে আরেকটি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। ড. ইউনূস বলেন, তরুণদের প্রযুক্তিগত আগ্রহকে কাজে লাগাতে চাই। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প আয়ের মানুষ যাতে নিজের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে, সেদিকে নজর রয়েছে। গ্রামীণফোনও সেভাবেই সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের অংশের লভ্যাংশ থেকে কেউ ব্যক্তিগতভাবে এক পয়সাও নেন না। সেই উদ্বৃত্ত মুনাফা দিয়ে দেশে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছে।

‘জিপেতেই সমাধান’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান এবং জিপে-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. আহমদ আরমান সিদ্দিকী। পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের চার নারী ঋণগ্রহীতার হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘টাকা পে’ কার্ড তুলে দেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

নিজেদের প্রয়োজনে বিমান কিনছে বাংলাদেশ, কোনো পক্ষকে খুশি করতে নয়

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, বাংলাদেশ কোনো পক্ষকে খুশি করতে নয়, বরং নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ…

7 minutes ago

২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৬ শতাংশ

২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৬০ শতাংশ হয়েছে, যেখানে পুরো বছরের সামগ্রিক…

17 minutes ago

কটিয়াদীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে জামায়াতের কর্মসূচি

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে মানববন্ধন ও লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি পালন করেছে উপজেলা জামায়াতে…

18 minutes ago

১০টি উড়োজাহাজ কিনতে এয়ারবাসের সাথে বিমান বাংলাদেশের চুক্তি সই

ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই করেছে বিমান বাংলাদেশ…

24 minutes ago

মতিঝিলের আলোচিত বাংলার বাণী ভবন এখন প্রতিমন্ত্রীর কব্জায়

মতিঝিলের ঐতিহাসিক বাংলার বাণী ভবনটি এখন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে। ৫ই…

38 minutes ago

সৌদির দুই বিমানবন্দরে হুতি হামলা, নিহত ৩ ও আহত ৩৬

সৌদি আরবের আবহা ও কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় ৩…

50 minutes ago

This website uses cookies.