Header Premium (728×90)

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনের গল্প

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর রাজাপাকসে সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও ভুল নীতি দেশটিকে ইতিহাসের ভয়াবহতম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত করে। তৎকালীন গোটাবাইয়া রাজাপাকসে সরকারের ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সময়ে ইস্টার হামলা এবং করোনা মহামারির কারণে পর্যটন ও প্রবাসী আয় ব্যাপকভাবে কমে যায়।

২০২১ সালে সরকার আকস্মিকভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নিষিদ্ধ করে জৈব কৃষিতে রূপান্তরের চেষ্টা চালায়, যা ধান ও চায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি আয় কমিয়ে দেয়। এর পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বিপুল বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করা হয়। এসব ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়লে ২০২২ সালে সংকট চরমে পৌঁছায়।

বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধ আমদানি অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সংকটে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং শুরু হয় এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য মানুষকে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াতে হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলে শ্রীলঙ্কা নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া বা সার্বভৌম ঋণখেলাপি ঘোষণা করে। এই অর্থনৈতিক দুর্ভোগ থেকে সৃষ্ট গণ-অভ্যুত্থান বা ‘আরাগালায়া’-এর মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

সংকটের দুই বছর পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বামপন্থি নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার সরকার রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আইএমএফ-এর সহায়তায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কা বর্তমানে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে এবং ২০২৫ সালে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রীলঙ্কার এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়, যেখানে রাজস্ব দুর্বলতা ও ভুল নীতি রোধ করা জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের সামপ্রতিক হিসাবে, শ্রীলঙ্কা উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ, যা ওই বছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের আগের ৩.৫ শতাংশ পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, তিন বছর আগেও যে দেশটি ঋণখেলাপি হয়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ছিল, সংস্কারের মাধ্যমে সেই দেশই এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পথে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

৯ লাখ টাকায় আপসের দাবি: গাড়িচাপায় নিহত শ্রমিকের ন্যায়বিচার কি অধরা?

বারিধারায় ফুটপাতে নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায়…

16 minutes ago

বিমান বাহিনীর ১৩২তম জেসিএসসি কোর্সের সনদপত্র বিতরণ করলেন বিমান বাহিনী প্রধান

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজারে ১৩২তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের (জেসিএসসি) সমাপনী ও সনদপত্র…

18 minutes ago

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মোকাবিলায় জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৪ প্রস্তাব

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘে চারটি প্রস্তাব দিয়েছেন…

28 minutes ago

হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ঘোষণা ইরানের

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির পূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখবে ইরান বলে জানিয়েছেন ইরানের…

45 minutes ago

রাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অ্যালামনাই সম্মিলনের থিম সং গাইলেন আরিফ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় অ্যালামনাই সম্মিলন ২০২৬-এর থিম সং ‘প্রিয় মতিহার’-এ কণ্ঠ দিয়েছেন সংগীতশিল্পী…

57 minutes ago

হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে জাতিসংঘে ৮০ দেশের যৌথ আহ্বান

হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছে ৮০টি দেশ। একই সঙ্গে…

1 hour ago

This website uses cookies.