বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগেই সরকারকে বড় ধরনের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের সমন্বয়ে গঠিত ১১ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটির মতামতের ভিত্তিতে তৈরি একটি গোপনীয় প্রতিবেদন ইতোমধ্যে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারিসহ অন্তত ৯ ধরনের বড় বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।
সরকার বর্তমানে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন নীতিমালা ২০২৬’ তৈরির কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যেই বিপিসির এই প্রতিবেদনটি নতুন নীতিমালার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, গত বছরের ১১ নভেম্বর বখতিয়ার আহমেদ জেনারেল ট্রেডিং ও পি সি এবং চলতি বছরের ২৪ মে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (বিওজিসিএল) নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল) আমদানি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানকে আহ্বায়ক এবং ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) মো. ইশতিয়াক হোসেনকে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— বিপিসির পরিচালক (অর্থ) নাজনীন পারভীন, পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ আসাদুল হক, ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) এ টি এম সেলিম, মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ, মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) ফেরদৌসী মাসুম হিমেল, মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন, যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া, পদ্মা অয়েলের এমডি মো. মফিজুর রহমান এবং মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এমডি মো. শাহীরুল ইসলাম। এই কমিটি গত ১৯ জুলাই তাদের প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৮ থেকে ৭০ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসির একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে প্রায় ১৫ লাখ টন পরিশোধিত তেল পাওয়া যায়। এছাড়া দেশীয় কনডেনসেট ও নাফথাভিত্তিক সরকারি-বেসরকারি মিনি রিফাইনারিগুলো থেকে বছরে প্রায় ৬ লাখ টন তেল সংগ্রহ করা হয়। চাহিদার বাকি বড় অংশই আমদানি করতে হয়। দেশে মোট চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশই ডিজেল, যার পরিমাণ প্রায় ৪৫.৫০ লাখ টন। প্রতি বছর এই চাহিদা অন্তত ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে ৬.৫০ লাখ টন, বেসরকারি মিনি রিফাইনারি থেকে ১ লাখ টন এবং অবশিষ্ট ৩৮ লাখ টন ডিজেল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। তবে ৩০ লাখ টন ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন রিফাইনারি ‘ইআরএল-টু’ চালু হলে আমদানি নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বাড়ায় ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমতেও পারে।
বিপিসির প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী দেশে পরিশোধিত তেল আমদানি ও বিপণনের একক অধিকার সরকারের। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই অনুমতি দেওয়া হলে তা নজির হিসেবে ব্যবহার করে অন্যরাও একই দাবি করবে। এতে সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারাবে এবং পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো রুগ্ণ হয়ে পড়বে। ফলে এলপিজি খাতের মতো পরিশোধিত জ্বালানি খাতও সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বা ডলার সংকট হলে বেসরকারি আমদানিকারকরা আমদানি বন্ধ করে দিতে পারে, যা দেশে তীব্র সংকট তৈরি করবে। চলমান ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল উত্তেজনার মধ্যেও বিপিসি ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখলেও বেসরকারি খাত লোকসান দিয়ে এই সেবা দেবে না। এছাড়া ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঝুঁকি এবং কৃত্রিম দাম বাড়ানোর চাপ সৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি খাত বেসরকারীকরণ করে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্য বড় সংকটে পড়েছে। শ্রীলঙ্কা তাদের জ্বালানি খাত আংশিক বেসরকারীকরণ করে লঙ্কা আইওসি (এলআইওসি) ও অন্যান্য সংস্থাকে যুক্ত করার পর ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটে ডলার সংকটের কারণে বেসরকারি আমদানিকারকরা তেল আমদানি বন্ধ করে দেয়। ফলে গণপরিবহন বন্ধ ও ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। পাকিস্তানে বেসরকারি অয়েল মার্কেটিং কোম্পানিগুলো বেশি মুনাফার জন্য তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, যার ফলে পাম্পগুলোতে প্রায়ই ‘নো পেট্রোল’ বোর্ড ঝোলে। আর যুক্তরাজ্য আশির ও নব্বইয়ের দশকে পুরো খাত বেসরকারি পর্যায়ে ছেড়ে দেওয়ার পর সাম্প্রতিক বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় বহু সরবরাহকারী দেউলিয়া হয়েছে এবং লাখ লাখ পরিবার ‘জ্বালানি দরিদ্রতা’র শিকার হয়েছে।
বেসরকারি খাতে জ্বালানি ছেড়ে দিলে যে ৯টি সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে:
১. সরকারের সঙ্গে নীতিগত দ্বিমত হলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে।২. আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আভাস পেলে বেশি মুনাফার আশায় তেল মজুত করার প্রবণতা তৈরি হবে।৩. দুর্গম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে তেল পাঠানো ব্যয়বহুল হওয়ায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে সরবরাহ কমিয়ে বা বন্ধ করে শুধু লাভজনক শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ সচল রাখবে। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হবে।৪. সংকটের সময় জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি হাতে থাকলে সরকার অসহায় হয়ে পড়বে।৫. মুনাফা বাড়াতে জ্বালানিতে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।৬. সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় ও ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়বে, যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।৭. তেলের দাম বাড়লে তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়বে। পাশাপাশি ওয়াসা ও চিকিৎসা খাতের ব্যয় বাড়ায় গরিব মানুষ সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে।৮. জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে।৯. জ্বালানির দাম একবার বাড়লে তার প্রভাবে বাজারের সবকিছুর দাম বেড়ে যায়, যা সহজে আর কমে না।বিপিসি জানিয়েছে, তাদের তিন অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা দেশজুড়ে নির্ধারিত মূল্যে তেল সরবরাহ করে আসছে। জ্বালানি তেল মজুতে বিপণন কোম্পানির নৌভিত্তিক, রেলহেডভিত্তিক এবং সড়কপথ ভিত্তিক সর্বমোট ২৭টি ডিপো রয়েছে। ভোক্তা প্রান্তে জ্বালানি সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে বিপিসির দেশব্যাপী ২৩৭৯টি (2379) ফিলিং স্টেশন, ৬৬৭টি প্যাকড পয়েন্ট ডিলার, ২৬৪০টি (2640) এজেন্সি, ১২৯টি মেরিন ডিলার, ৩১১১টি (3111) এলপিজি গ্যাস ডিলার এবং ১৭টি বাঙ্কার ডিলার রয়েছে। নৌপথ, রেলপথ ও সড়কপথে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা রয়েছে। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক সংকটেও বিপিসি উচ্চ ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ সচল রেখেছে, যা বেসরকারি খাতের পক্ষে সম্ভব নয়।
বিপিসি গত পাঁচ বছরে সরকারকে মোট ৭১ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছে। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪,৭৯৮ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪,৭৯৩ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪,৬৪৮ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২,৬৭৫ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪,৮৫৭ কোটি টাকা রাজস্ব দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতকে এই অনুমতি দেওয়া হলে সরকারের এই আয়ের পথ সংকুচিত হবে। তাই জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির একক নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই রাখার সুপারিশ করেছে কমিটি। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০২৩ সালের নীতিমালার আওতায় অপরিশোধিত তেল আমদানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নতুন রিফাইনারি স্থাপনে উৎসাহিত করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছে কমিটি।
এতে উল্লেখ করা হয়, দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৮-৭০ লাখ টন। বিপিসির আওতাধীন একমাত্র পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রেডের প্রায় ১৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল পাওয়া যায়। এর বাইরে স্থানীয় কনডেনসেট এবং নাফথা নির্ভর সরকারি ও বেসরকারি মিনি রিফাইনারিগুলো থেকে বছরে প্রায় ছয় লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরকার নির্ধারিত দরে সংগ্রহ করা হয়। অবশিষ্ট বিপুল পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটানো হয়।
১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে যুক্তরাজ্য তাদের সম্পূর্ণ জ্বালানি ও ইউটিলিটি খাত বেসরকারিতে ছেড়ে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার পর বহু বেসরকারি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল এক বছরেই দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায় এবং লাখ লাখ পরিবার ‘জ্বালানি দরিদ্রতা’র শিকার হয়।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন…
ডেঙ্গু ও হামে মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম…
নিউইয়র্কে আয়োজিত জাতিসংঘের এক বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক…
নাটোর সদর উপজেলার জংলি ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক ও ছাত্রশিবিরের সাবেক ইউনিয়ন সভাপতি নূর হোসেন একটি…
রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন…
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা ও দাদাগিরি যত বাড়বে, ইরানি…
This website uses cookies.