Header Premium (728×90)

Categories: সারাদেশ

ভোলার সাব-রেজিস্ট্রার মামুন সিকদারের বিরুদ্ধে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

ভোলার একাধিক সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও দলিল নিবন্ধনে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সাব-রেজিস্ট্রার মো. মামুন সিকদারের বিরুদ্ধে। পেশকার, কেরানি, দলিল লেখক ও দালালদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দলিল লেখকের দাবি, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতি মাসে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি টাকারও বেশি অবৈধ অর্থ আদায় করা হয়। তবে সাব-রেজিস্ট্রার মামুন সিকদার তাঁর কার্যালয়ে কোনো ধরনের ঘুষ বা অনিয়মের কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভোলা সদর ছাড়াও দৌলতখানের বাংলাবাজার, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, শশীভূষণ ও দক্ষিণ আইচা সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে মামুন সিকদার সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে এককভাবে দায়িত্ব পালন করেন। যেদিন তিনি এসব কার্যালয়ে বসেন, সেদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি দলিল নিবন্ধিত হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দলিলের মূল্যের ওপর ০.৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ ‘অফিস খরচ’ হিসেবে আদায় করা হয়। এই হিসাবে প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি অর্থ অবৈধভাবে আদায় করা হতে পারে বলে দাবি করা হলেও এর কোনো স্বাধীন সরকারি বা নিরীক্ষিত নথি পাওয়া যায়নি। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বা নামের অসংগতি, প্রয়োজনীয় টিআইএন সনদ কিংবা আয়কর রিটার্ন না থাকার অজুহাতে এবং ফাইলের ছোটখাটো ত্রুটি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। এমনকি বেশি মূল্যের জমি কম মূল্যে দেখিয়ে সাফ-কবলা দলিল করার সুযোগ এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের কয়েকজন সরাসরি তাঁদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেছেন। ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বাংলা বাজার এলাকার বাসিন্দা শরীফ তালুকদার জানান, ১ শতাংশ জমির মূল্য ১৬ লাখ টাকা দেখিয়ে সাফ-কবলা দলিল করার জন্য তিনি দলিল লেখক শরীফ পাটোয়ারীকে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে মূল দলিল তুলতে গিয়ে দেখেন, সাফ-কবলার পরিবর্তে সেখানে হেবা-বিল-এওয়াজ মূলে দলিল সম্পাদন করা হয়েছে, যেখানে দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে কোনো পারিবারিক সম্পর্কই ছিল না। এ বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করতে গেলে তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করা হয়। পরবর্তীতে সাফ-কবলা দলিলটি বুঝে নিতে গ্রহীতাকে আরও ৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছে বলে জানান রিয়াজ সিকদার নামের আরেক ভুক্তভোগী।

অনুরূপ অভিজ্ঞতার কথা জানান চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার চর মানিকা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন। ভাই-বোনের মধ্যে হেবা-বিল-এওয়াজ দলিল করার সময় অতিরিক্ত টাকা না দেওয়ায় তাঁকে দীর্ঘদিন ঘোরানো হয়। পরবর্তীতে সাব-রেজিস্ট্রারের কথিত সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে দুই দফায় ৩০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাঁর দলিলটি নিবন্ধিত হয়। ফরিদ উদ্দিন অভিযোগ করেন, জেলায় সাব-রেজিস্ট্রারের সংখ্যা কম থাকায় দক্ষিণ আইচা কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস হয় না। আর যেদিন অফিস হয়, সেদিন অতিরিক্ত টাকা না দিলে দলিল নিবন্ধন করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক অভিযোগ করেছেন, সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে দলিলের মূল্য অনুযায়ী অতিরিক্ত ০.৫ থেকে ১ শতাংশ অর্থ পেশকার বা কেরানির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে পৌঁছাতে হয়। এছাড়া হেবা দলিল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক মর্টগেজ দলিল এবং বালাম বই থেকে নকল বা সত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। দলিল লেখকদের দাবি, এই ঘুষ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাঁর সনদ বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়, ফলে ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পান না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার মো. মামুন সিকদার তাঁর কার্যালয়ে সব ধরনের অনিয়ম ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে অনুসন্ধানী দলের কাছে থাকা ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও ফুটেজ দেখানো হলে তিনি বলেন, ভিডিওতে যারা জড়িত রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো অভিযোগ থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেলা রেজিস্ট্রারকে জানানো উচিত।

ভুক্তভোগীরা এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং কার্যালয়গুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান এবং জড়িত কর্মকর্তা, কর্মচারী, দলিল লেখক ও দালালদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মো. আনিসুর রহমান জানান, তিনি বর্তমানে অসুস্থতার কারণে ছুটিতে রয়েছেন। তবে ঘুষ গ্রহণের ভিডিও এবং সাব-রেজিস্ট্রার মামুন সিকদারের বক্তব্য তাঁর নজরে এসেছে। ছুটি শেষে অফিসে ফিরে তিনি পুরো বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh

Recent Posts

মাদারগঞ্জে অনিয়মের দায়ে দুই ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী বাজারে অনিয়মের অভিযোগে দুই ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ…

3 hours ago

নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক এমপি মোশতাক আহমেদ রুহী গ্রেপ্তার

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের একটি বাসা থেকে নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহীকে…

4 hours ago

নিউ ইয়র্কে নামছে না নেতানিয়াহুর উড়োজাহাজ

যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করছেন না ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন…

4 hours ago

মূল্যস্ফীতির চাপে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী প্রবণতায় থাকলেও তা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার বেশি হওয়ায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে…

4 hours ago

টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করতে নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করতে বিদেশি ট্রেডিং পার্টনার ব্যাংকের নামে প্রারম্ভিক জমা ছাড়াই টাকা ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট…

4 hours ago

পাকিস্তান–চীন নতুন সীমান্ত চুক্তি নিয়ে ভারতের তীব্র প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন সীমান্ত চুক্তিকে আইনি ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। বিতর্কিত…

4 hours ago

This website uses cookies.