Header Premium (728×90)

অপরাধ

ফেনী সোনাগাজী মডেল থানায় শালিসের ব্যবসা বাণিজ্য চলছে

ফখরুল আলম সাজু
ক্রাইম রিপোর্টার:

ফেনী জেলা সোনাগাজী থানায় এরিয়া সন্ধ্যা নামলেই জমজমাট হয়ে ওঠে সোনাগাজী মডেল থানা প্রাঙ্গণ। শত শত লোকের আনাগোনা শুরু হয় থানার ভেতরে। থানার ভেতরের বিভিন্ন কক্ষে শুরু হয় শালিস বাণিজ্য। জিডি থেকে শুরু করে অভিযোগ, হামলার মামলা, জমি সংক্রান্ত মামলায়, রাজনৈতিক ঘটনায় পক্ষ-প্রতিপক্ষকে নিয়ে প্রতিদিনই নিয়মিত চলে শালিস বাণিজ্য।

এ সব শালিস বাণিজ্যে ওসি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল), পুলিশ ইন্সপেক্টরদের পাশাপাশি অংশ নেন থানার নির্ধারিত স্থানীয় অভিজ্ঞ শালিসদার।

শালিশে পরাজিত পক্ষকে গুনতে হয় জরিমানা। পক্ষ-বিপক্ষ উভয় পক্ষকে থানায় দিতে হয় নির্ধারিত মোটা অংকের টাকা। টাকা না দিলে ঘটনার ব্যাক্তি বাড়িয়ে কোর্ট কাচারির ভয় দেখানো হয়।

আবার কখনও কখনও কোর্টেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শুক্র ও শনিবার শালিস বাণিজ্যের সংখ্যা বেশী থাকে বলে জানান থানায় কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কনস্টেবল। তিনি বলেন, প্রতিদিনই কয়েকটি শালিস থাকে। শুক্র ও শনিবারে বন্ধের দিন বেশী থাকে।

সরেজমিন থানায় গিয়ে দেখা যায়, ওসির কক্ষে ভাড়াটে শালিসদার সাতবাড়িয়ার বেলায়েত ও ৮/১০ জন লোকসহ দুই পক্ষকে নিয়ে শালিস করছেন স্বয়ং ওসি। ভিতরে যেতে চাইলে এক কনস্টেবল বাধা দিয়ে বলেন, ঘণ্টাখানেক পরে আসেন।

দোতলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল) কক্ষে গেলে দেখা যায়, একদল যুবক কক্ষের বাহিরে ও কয়েকজন কক্ষের ভিতরে অবস্থান করছেন। চরখন্দকার এলাকার চর দখল করে প্রকল্প কেটে মৎস্য লুট ও ভাগাভাগি নিয়ে উত্তর চরছান্দিয়া চট্টগ্রাম সমাজের বাসিন্দা আর্মি আনোয়ারের নেতৃত্ব চিটাগং পার্টির সালিশ বৈঠক চলছে। দেখা করতে চাইলে কনস্টেবল বলে অপেক্ষা করতে বলেন।

২য় তলার পাশে ওসি তদন্তের কক্ষেও লোকজনের ভিড় দেখা যায়। ২০ মিনিট অপেক্ষা করার পরও শালিস শেষ না হওয়ায় কথা না বলেই ফেরত যেতে হয় এই প্রতিনিধিকে। এসআই ও এএসআইদের জন্য রয়েছে আলাদা শালিশ করার ব্যবস্থা। মাঝে মাঝে পুলিশ ক্যান্টিনে ও শালিস করতে দেখা যায়।

এ ছাড়াও সোনাগাজী মডেল থানার ওসি বায়েজিদ আকন্দের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কোনো অপরাধ ছাড়াই গ্রেফতার করে টাকা হাতিয়ে নিয়ে সাধারণ মামলায় গ্রেফতার দেখানো, বিভিন্ন চুরি, ডাকাতি, হামলা ও সংঘর্ষে ঘটনায় আহতদের মামলা না নেওয়ার ও ফসলি জমি মাটি কাটায় ট্রাক্টর মাসিক টাকার বিনিময়ে চলতে দেওয়া, মাসিক হারে অবৈধ বালু মহাল থেকে টাকা আদায়, জিডি-অভিযোগ-মামলা দায়েরের নামে টাকা আদায়, মামলায় দায়ের করা আসামিদের আটকের নামে বাণিজ্য করা হয়। টাকার বিনিময়ে ওয়ারেন্ট ভুক্ত আসামিকে না ধরা। ওসির এসব অনিয়মে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ।

অভিযোগ আছে, নিয়মিত সালিশ বাণিজ্য বসিয়ে পুলিশ ও স্থানীয় কতিপয় নেতা টাকা ভাগবাটোয়ারা করেন। জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও পাওনা টাকা আদায়ের মতো ঘটনার সালিশে এমনটি বেশি ঘটে থাকে।

সূত্রে জানা যায়, জিডি ও অভিযোগ করতে প্রথমে ডিউটি অফিসারকে ৫০০, ১০০০ ও ২০০০ টাকা দিতে হয়। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে মামলার ধরন অনুযায়ী ৫ থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত দিতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ মামলার ক্ষেত্রে আসামি ইন-আউটের জন্য মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য ১/২ হাজার টাকা ও মামলা বা অভিযোগ থাকলে মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। যার ফলে ৫ আগস্টের পর হত্যা মামলার আসামি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দেশের বাহিরে চলে গেছে।

১ সেপ্টেম্বর সোমবার এক ব্যবসায়ীকে লাঞ্ছিত ও দাবিকৃত টাকা না দেওয়ায় মামলা দিয়ে ফাঁসানোর হুমকির অভিযোগে ফেনী প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. ইলিয়াছ। এ ঘটনায় সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। মো. ইলিয়াছ সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড পান্ডব বাড়ির মো. আব্দুল হাদীর ছেলে। তিনি বর্তমানে এসব হুমকির কারণে সোনাগাজী ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানান।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারপর থেকে আমার বাড়িতে একাধিকবার পুলিশ পাঠানো হয়, যদি দ্রুত সময়ে থানায় উপস্থিত না হই তাহলে পরিবারের অন্য সদস্যদের থানায় আটক করে নিয়ে যাওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে ২৬ আগস্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশে জোরপূর্বক আমাকে সালিশি বৈঠকে উপস্থিত করানো হয়।

আমি নিজে বাদী হলেও কোনো তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়ে বিবাদীর কাছ থেকে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নিয়ে ওসি বায়েজীদ আকন আমাকে থানায় তার কক্ষে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। তখন বিবাদীকে দুই দিনের মধ্যে টাকা দিতে আমাকে নির্দেশনা দেন। এ সময়ে টাকা দিতে ব্যর্থ হলে আমাকে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলায় আসামি করার হুমকি প্রদান করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হত্যা, ডাকাতি, নাশকতা ও বিষ্ফোরক আইনের মামলায় অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকলেও পুলিশকে ম্যানেজ করে এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বড় বড় অনেক মাদক ব্যবসায়ীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি সোনাগাজী বাসী।

সোনাগাজী থানার ৩০০ গজের মধ্যে একটি মোবাইল দোকালে চুরির ঘটনার ১২ দিন পার হলেও এখনও উদঘাটন হয়নি রহস্য। ওসি জানান, চোর শনাক্ত করতে তিনদিনও লাগতে পারে তিন বছরও লাগতে পারে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

২১ আগস্ট ভোরে সোনগাজী বাজারস্থ ভাই ভাই টেলিকম নামে একটি মোবাইলের দোকানে কোটি টাকার মোবাইল সামগ্রী চুরি হয়, সিসি ক্যামেরায় চোরের ছবি স্পষ্ট হলেও এখনো ধরাচোঁয়ার বাহিরে চোর চক্র। গত ২৮ই আগস্ট চরচান্দিয়া ইউনিয়নের সওদাগন হাট এলাকায় আবদুল কুদ্দুসের ঘরের গেইটের তালা কেটে প্রবেশ করে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার সহ প্রায় ২২ লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়। এ ঘটনায় গৃহবধূ কহিনুর আক্তার থানায় মামলা দিলেও দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি।

গত ২০ এপ্রিল দক্ষিণ চরছান্দিয়া গ্রামের লন্ডনীপাড়া এলাকার আবদুল হালিম মেম্বারের ছেলে মিজানুর রহমানকে যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়। তার স্ত্রী জীবনারা খাতুন সুমি জানান, স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর সাথে মিজানের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। তারাই এ অস্ত্র ঘরে রেখে পুলিশ দিয়ে তাকে ফাঁসিয়েছে।

মিজানুর রহমানের ভাই ব্যবসায়ী এম ফখরুল ইসলাম জানান, পারিবারিক ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে তার ভাইকে কেউ ষড়যন্ত্র করে ফাঁসিয়েছে, এই বিষয়ে তিনি যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করে তার ভাইকে মুক্ত করে আনবেন বলে ফেইসবুক লাইভে বলেন। পরদিন তাকেও আটক করে অজ্ঞাত আসামি বানিয়ে বিস্ফোরক মামলায় গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়।

একই ভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বিভিন্ন মামলায় ইন আউট বাণিজ্য করেন। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের টাকার বিনিময়ে এলাকায় থাকার সুযোগ করে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার প্রভাবশালী কোনও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ নিয়ে এলে তা গ্রহণ না করে ঐ নেতাকে খবর দিয়ে তা মীমাংসা করার ব্যবস্থা করেন।

স্থানীয় সাংবাদিকরা বলেন, কোনও তথ্যের জন্য আমরা তার (ওসির) অফিসে গেলে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং পরে আসতে বলেন। ফোন দিলে রিচিভ করেন না। বিভিন্ন সময় সাংবাদিকরা তার কাজে ব্যাঘাত করছে বলেন তিনি।

উপজেলার চর চান্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা শাহীন মিয়া বলেন, ঈদের পরের দিন সকালে বাড়ির উঠানে ফেলে পূর্ববিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের সাতজন লোক আমাকে মারধর করে। দা দিয়ে কুপিয়েছে। মাথায় চারটি সেলাই ও মুখের মাড়িতে তিনটি সেলাই লেগেছে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিলেও তা মামলা হিসাবে নথিভুক্ত হয়নি। সুষ্ঠু বিচার পাব বলে থানায় দ্বারস্থ হলেও বিচার পাইনি।

পুলিশ সুপার কার্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত সোনাগাজী মডেল থানায় ১৪টি চুরি, ৪টি খুন, ৫টি ধর্ষণ, ১২টি নারী ও শিশু নির্যাতনসহ অন্যান্য ৮৪টি সহ মোট ১৪৪টি অপরাধ সংগঠিত হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বায়েজিদ আকন বলেন, অভিযোগ কারী আপাদমস্তক এক প্রতারক প্রকৃতির লোক। তার পাওনাদারকে টাকা না দেওয়ার জন্যই পুলিশের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। আমার বিরুদ্ধে করা এসব অভিযোগ সত্য নয়। অনেক ঘটনা আমার মনেও নেই। স্বার্থের হানি ঘটলে মানুষ কত অভিযোগই করে।

পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, পুলিশের কেউ যদি কোনো অপরাধ বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

editor

Recent Posts

ঢাবি ক্যাম্পাসে গাড়িচাপায় ৭ শিক্ষার্থী আহত, চালক সহপাঠী আটক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে গাড়িচাপায় ৭ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। অভিযুক্ত সাদমান সাকিব বিশ্ববিদ্যালয়ের…

7 minutes ago

উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় কোনো আপস নয়: কাতার আমির

আঞ্চলিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আপস করা হবে…

7 minutes ago

অক্টোবরের ১২ দিনে ১২৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা

চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ১২ দিনে দেশে ১২৯ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত…

17 minutes ago

স্ত্রীকে হত্যার পর ভারতে পালানোর সময় পিবিআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার মজনু

সহকর্মীদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলায় স্ত্রী বীথি আক্তারকে শ্বাসরোধে হত্যার পর ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে মজনু…

18 minutes ago

মাদক ও দখলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ ডিএমপি কমিশনারের

মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ ও ভূমি দখলবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শিথিলতা না দেখিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা…

25 minutes ago

নিউইয়র্কে ড. ইউনূসকে হেনস্তায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ…

26 minutes ago

This website uses cookies.