Header Premium (728×90)

লোরকা থেকে এভারেট: পাঠজীবন ও লেখার গল্প শোনালেন রেবেকা পেরি

শৈশবের ঘরোয়া পড়ার স্মৃতি থেকে শুরু করে বিশ্বসাহিত্যের ক্ল্যাসিক ও সমকালীন রচনা—নিজের পাঠজীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও লেখার অনুপ্রেরণা নিয়ে কথা বলেছেন ব্রিটিশ কবি ও ঔপন্যাসিক রেবেকা পেরি। প্রায় পাঁচ বছর বয়সে ভাইয়ের সঙ্গে ঘরের কার্পেটে বসে স্পাইক মিলিগানের ‘অন দ্য নিং ন্যাং নং’ পড়ার মধ্য দিয়ে যার পাঠযাত্রার স্মৃতি শুরু। সাত থেকে দশ বছর বয়স পর্যন্ত একটি বড় হলুদ মলাটের রূপকথার সংকলন তাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। ওই সংকলনের ‘দ্য লিটল মারমেইড’ পড়তে গিয়ে ছোট্ট মৎস্যকন্যার সমুদ্রে ফেনা হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি তাকে চরম অসহায়ত্ব ও হতাশায় ফেলে দেয়। পাঠক হিসেবে তিনি তখনই প্রথম অনুভব করেন যে, গল্পের পরিণতির ওপর পাঠকের কোনো হাত থাকে না; গল্প তার নিজের ভাগ্য বেছে নিলে পাঠকের ইচ্ছার মূল্য থাকে না। তবে স্কটিশ রূপকথা ‘দ্য ব্ল্যাক বুল অব নরওয়ে’ ছিল তার বিশেষ পছন্দের, যা তার পরবর্তী সব লেখার গভীরে শিকড় হিসেবে রয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।

কৈশোরে পা দিয়ে স্কুলে জিসিএসই নাট্যশিক্ষার অংশ হিসেবে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার ‘কালেক্টেড প্লেজ’ পড়ার সুযোগ পান রেবেকা। পরে নিজ উদ্যোগেই খুঁজে নেন লোরকার কবিতা। লোরকাকে বাদ দিয়ে নিজের কৈশোরের পাঠ কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক কল্পনা করা অসম্ভব বলে জানান তিনি। লোরকার ‘সিটি দ্যাট ডাজ নট স্লিপ’ কবিতার পঙ্‌ক্তি—যেখানে হৃদয় ভেঙে ছুটে যাওয়া মানুষের রাস্তার মোড়ে নীরব কুমিরের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্য রূপায়িত হয়েছে—তা তাকে হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলকের মতো নাড়া দিয়েছিল। তার মতে, কবিতার মূল কাজই হলো এমন কোনো দৃশ্য সামনে আনা, যা আগে কখনো দেখা না গেলেও মনে হয় যেন পাঠক দীর্ঘদিন ধরে তারই অপেক্ষায় ছিলেন।

একইভাবে কবি ফ্র্যাঙ্ক ও’হারার লেখা পেরির কাব্যভাবনাকে বদলে দেয়। ও’হারাকে পড়ার আগে কবিতা তার কাছে কেবলই এক দূরবর্তী, পবিত্র ও গম্ভীর বিষয় বলে মনে হতো। কিন্তু ও’হারা কবিতার দুয়ার খুলে দিয়ে বাইরের সাধারণ জীবন, আনন্দ ও আকস্মিকতাকে সাহিত্যের ভেতরে নিয়ে আসেন। ফলে সাহিত্য আর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো রাজ্য থাকে না। অন্যদিকে, কোনো একটি নির্দিষ্ট বই তাকে লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়নি; কারণ তিনি ছোটবেলা থেকেই লিখতেন। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর যখন বুঝলেন সাধারণ মানুষও সুযোগ ও ভাগ্যবশত বই লিখতে পারে, তখন পার্সিভাল এভারেটের ‘দ্য ট্রিজ’ বইটি তাকে প্রথমবারের মতো একটি উপন্যাস লেখার সাহস জুগিয়েছিল।

মনের ভেতর সব এলোমেলো হয়ে গেলে রেবেকা পেরি ফিরে যান অ্যান কারসনের ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’ (বিশেষ করে ‘দ্য গ্লাস এসে’) বইটির কাছে। এক পৃষ্ঠার মধ্যেই ভাষার বিচিত্র ও সুদূরপ্রসারী ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার শক্তি রয়েছে এই বইটিতে। পাশাপাশি জে কে রাওলিংয়ের ‘হ্যারি পটার’ সিরিজ তার শৈশবের বড় অংশজুড়ে ছিল, যদিও স্রষ্টার অবস্থান থেকে শিল্পকর্মকে আলাদা করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তিরিশে পৌঁছানোর আগেই তিনি আবিষ্কার করেন ডরিস লেসিংয়ের ‘দ্য গোল্ডেন নোটবুক’, যা পড়ার জন্য যেকোনো বয়সকেই তিনি উপযুক্ত মনে করেন।

বর্তমানে রেবেকা পেরি পড়ছেন অগাস্টিন সার্ফের ‘কমপেনসেশন’ বইটির প্রুফ কপি, জামাইকা কিনকেইডের ‘মাই গার্ডেন (বুক)’ এবং সেপ্টেম্বরে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা এ কে ব্লেকমোরের ‘ডুম পেইন্টিং’। এর বাইরে ২০২৩ সালে প্রয়াত কবি গবোইগা ওদুবানজোর কবিতার বই ‘অ্যাডাম’ সবসময় রাখা থাকে তার ডেস্কের ওপরের তাকে। প্রিয় মানুষের হারিয়ে যাওয়ার বেদনা যখন তীব্র হয়, তখন একটি কবিতা পড়ে তিনি অনুভব করেন যে শব্দের ভেতরেই মানুষ নিজের জায়গা রেখে যেতে পারে, অনুপস্থিতি মানেই সম্পূর্ণ মুছে যাওয়া নয়।

নিজের অভিজ্ঞতা ও উপন্যাসের ভাবনা তুলে ধরতে গিয়ে পেরি তার ‘মে উই ফিড দ্য কিং’ বইয়ের একটি ভাবসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি তুলে ধরেন দৃশ্য তৈরির পেছনের বাস্তবতা—পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজ, দর্শকের কৌতূহল, কিংবা মঞ্চে কৃত্রিম বস্তুর অসতর্ক ব্যবহারে নাটকের মায়া ভেঙে যাওয়ার কাহিনি। রাজকীয় কাঠের মেঝেতে কৃত্রিম ডালিম পড়ার ফাঁপা শব্দ বা রাজার হাতের মুরগির রানের তলে প্রস্তুতকারকের লোগো বেরিয়ে পড়ার মতোই ছোট্ট অসতর্কতায় দৃশ্যের মৃত্যু ঘটে। তিনি মনে করেন, ভালোবাসার কঠিন দিকটি হলো যত্ন নিয়ে কোনো কিছু তৈরি করে পৃথিবীর হাতে তুলে দেওয়ার পর তার ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া রেবেকা পেরি ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টারের সেন্টার ফর নিউ রাইটিং থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ২০১৫ সালে প্রকাশিত তার প্রথম কবিতা সংকলন ‘বিউটি/বিউটি’ মাইকেল মারফি মেমোরিয়াল পুরস্কার জেতে এবং টি এস এলিয়ট পুরস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়। ২০২১ সালে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘স্টোন ফ্রুট’ এবং ২০২৩ সালে গদ্যগ্রন্থ ‘অন ট্র্যাম্পোলিনিং’ প্রকাশিত হয়। ২০২৬ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘মে উই ফিড দ্য কিং’ ওয়াটারস্টোনস ডেব্যু ফিকশন পুরস্কার জেতার পাশাপাশি বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় জায়গা করে নেয়। বর্তমানে তিনি লন্ডনেই বসবাস করছেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফর উপলক্ষে সাঈদ আল নোমানের আনন্দ মিছিল

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরকে কেন্দ্র করে পাহাড়তলীর সাগরিকা মোড়ে আনন্দ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন…

28 minutes ago

গান গাওয়ায় মামলা ও বাবার সঙ্গে মারধরের অতীত স্মৃতি শোনালেন মনির খান

বাড়িতে গান গাওয়ার কারণে গ্রামবাসীর মারধর, একাধিক মামলা এবং বিচারকের সামনে গান গেয়ে বেকসুর খালাস…

33 minutes ago

ভূঞাপুরের অলোয়ায় পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে এমপি আবদুস সালাম পিন্টু

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অলোয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন শারদীয় দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও স্থানীয় পূজারিদের সঙ্গে কথা বলেছেন…

48 minutes ago

শত্রুদের ওপর যেকোনো মুহূর্তে হামলার হুঁশিয়ারি নেতানিয়াহুর

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে শত্রুদের বিরুদ্ধে যেকোনো মুহূর্তে হামলা চালানোর জন্য ইসরায়েল প্রস্তুত রয়েছে বলে…

1 hour ago

ধর্মের পরিচয়ে নয়, সবাই এই দেশের সন্তান: প্রধানমন্ত্রী

ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ধর্মের পরিচয়ে নয়, বরং সবাই এই দেশের…

1 hour ago

ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গু রোগীর উপচে পড়া ভিড়, বারান্দায় চলছে চিকিৎসা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হওয়ায় বারান্দা,…

1 hour ago

This website uses cookies.