Header Premium (728×90)

Categories: ধর্ম

শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর স্নেহ ও ভালোবাসার অনন্য শিক্ষা

শিশুদের বিকাশ ও সুরক্ষায় স্নেহ, নৈতিক শিক্ষা ও সুন্দর আচরণ অপরিহার্য। ইসলামে শিশুদের প্রতি মমতা ও দায়িত্বশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে সন্তানদের আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সুরা আত-তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমরা পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’ আলেমরা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, সন্তানকে কেবল ভরণপোষণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং তাকে ইমান, নৈতিকতা ও সৎকর্মের শিক্ষা দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা অভিভাবকদের প্রধান দায়িত্ব। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর নিজের জীবনাচরণের মাধ্যমে শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

মহানবী (সা.) শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাদের সঙ্গে সব সময় কোমল আচরণ করতেন। তিনি তাদের কোলে নিতেন, আদর করতেন এবং নিজে আগে সালাম দিতেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) তাঁর নাতি হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু খেলে সেখানে উপস্থিত আকরা ইবনে হাবিস (রা.) বলেন, ‘আমার দশটি সন্তান রয়েছে; আমি তাদের কাউকেই চুমু দিইনি।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ ও তাদের নিরাপদ অনুভূতি দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

নাতি হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.)-এর প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মমতা ছিল। তিনি তাদের সঙ্গে সময় কাটাতেন এবং আল্লাহর দরবারে তাদের প্রিয় হওয়ার প্রার্থনা করতেন। তবে ভালোবাসার পাশাপাশি তিনি তাদের সঠিক নৈতিক শিক্ষাও দিতেন। একবার হাসান (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোলে থাকা অবস্থায় সদকার একটি খেজুর মুখে দেওয়ার চেষ্টা করলে নবীজি (সা.) তা বের করে দিয়ে বলেন, ‘তুমি কি জানো না, আমরা সদকা খাই না?’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, শিশুর বয়স ও মানসিক সক্ষমতা বিবেচনা করে ছোটবেলা থেকেই তাকে ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখানো উচিত।

এমনকি নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময়ও মহানবী (সা.) শিশুদের কান্নার প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা করি; কিন্তু কোনো শিশুর কান্না শুনলে তার মায়ের কষ্টের কথা বিবেচনা করে নামাজ সংক্ষিপ্ত করি।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। শিশুর কান্নাকে বিরক্তির কারণ না ভেবে মায়ের মনস্তাত্ত্বিক কষ্টের প্রতি তাঁর এই সংবেদনশীলতা এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত। এছাড়া, শিশুদের সামাজিক মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদা বাড়াতে তিনি তাদের সালাম দিতেন। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিতেন (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। এটি শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও সমাজের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।

শিশুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ করার ক্ষেত্রেও মহানবী (সা.) এক চমৎকার আদর্শ রেখে গেছেন। তবে তাঁর এই রসিকতা বা আনন্দের মধ্যে কখনো মিথ্যা, প্রতারণা বা কাউকে অপমান করার বিষয় থাকত না। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের সঙ্গে মিশতেন এবং তাদের বয়স উপযোগী আন্তরিক আচরণ করতেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, শিশুদের কেবল শাসনে না রেখে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ইসলামে এতিম শিশুদের অধিকার ও যত্নের বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র কুরআনের সুরা আদ-দুহার ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অতএব, তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।’ এছাড়া সুরা আন-নিসার ১০ নম্বর আয়াতে এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) এতিমের দায়িত্ব পালনকারীর জন্য জান্নাতে বিশেষ মর্যাদার ঘোষণা দিয়ে তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল নির্দেশ করে বলেছেন, ‘আমি এবং এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এভাবে থাকব।’ (সহিহ বুখারি)।

সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব ইসলামে বাবা-মা উভয়ের ওপরই ন্যস্ত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। তাই সন্তানদের অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষার পাশাপাশি তাদের সৎ চরিত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলি শেখানো অভিভাবকদের দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনে হজরত লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে যেভাবে আল্লাহর সঙ্গে শরিক না করা, নামাজ প্রতিষ্ঠা, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে বাধা ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছিলেন (সুরা লোকমান, আয়াত ১৩, ১৭-১৯), তা সন্তান পালনের এক চিরন্তন আদর্শ।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিশুরা স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গেমে বুঁদ হয়ে থাকছে, যার ফলে পরিবার থেকে তারা পর্যাপ্ত মনোযোগ পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত শাসন, তুলনা বা অপমান করার প্রবণতা দেখা যায়। এই পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষাই হতে পারে সঠিক সমাধান। শিশুদের ভুলত্রুটি ধৈর্যের সাথে বোঝানো, তাদের কথা শোনা, ভালো কাজের প্রশংসা করা এবং পর্যাপ্ত সময় ও ভালোবাসা দেওয়া তাদের মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আজকের শিশুই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে, তাই তাদের প্রতি মমতা ও নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh

Recent Posts

দেবিদ্বারে মাকে কুপিয়ে ও আট মাসের ভাতিজিকে আছড়ে হত্যা

কুমিল্লার দেবিদ্বারে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিজের মা ও আট মাস বয়সী ভাতিজিকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে…

9 minutes ago

গুলশানে গ্রেফতার সন্দ্বীপের সাবেক আওয়ামী লীগ এমপি মিতা

চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতাকে গুলশান-২ এলাকার একটি বাসা…

13 minutes ago

যশোর প্রেস ক্লাবের নবনির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর

যশোর প্রেস ক্লাবের নবনির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রেস…

20 minutes ago

জাতিসংঘে বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাৎ

নিউইয়র্কে অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের সৌজন্য…

28 minutes ago

নিম্ন আয়ের দেশের ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে নতুন কাঠামো আনছে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিস্থিতি আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করতে যৌথ ঋণ টেকসই মূল্যায়ন কাঠামো (ডিএসএফ)…

37 minutes ago

বুধবার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের ছুটি

পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে আগামী বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই…

40 minutes ago

This website uses cookies.