Header Premium (728×90)

হোমার থেকে এআই: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে গল্পকারের ভবিষ্যৎ

হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ‘দ্য ওডিসি’ সৃষ্টির পর প্রায় আটাশ শ বছর পেরিয়ে গেছে। সময়ের ব্যবধানে ২০০৫ সালে এসেছে ব্লেক স্নাইডারের ‘সেভ দ্য ক্যাট!’ কিংবা আরও সম্প্রতি ড্যান হারমনের ‘স্টোরি সার্কেল’। তবে যুগের পর যুগ পার হলেও গল্পের অন্তর্নিহিত মূল কাঠামোটি কিন্তু একই রয়ে গেছে। চেনা জগৎ ছেড়ে মানুষের অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা, নানা সংকটের মুখোমুখি হওয়া এবং পরিশেষে বদলে গিয়ে ঘরে ফিরে আসার এই চিরন্তন আখ্যান হাজার বছর ধরে কেবল রূপ পরিবর্তন করেছে, কিন্তু এর মূল চেতনা হারায়নি।

প্রাচীন গ্রিসের হোমার আর পারস্যের সুফি কবি জালালুদ্দিন রুমির গল্পের ধরন ভিন্ন হলেও তাদের গন্তব্য এক। ওডিসিউসের যাত্রা ছিল পার্থিব ভূগোলের মধ্য দিয়ে, যেখানে তিনি ঘরে ফেরার তীব্র আকুলতায় চালিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, রুমির ‘মসনবি’র যাত্রা ছিল চেতনার গহীনে। সেখানে নদীর তীর থেকে বিচ্ছিন্ন, কেটে ফেলা একটি ফাঁপা বাঁশের শূন্যতা দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায়, তখন বিচ্ছেদের সুর বেজে ওঠে। ওডিসি যেখানে ঘরে ফেরার ব্যাকুলতা দেখায়, মসনবি সেখানে প্রশ্ন তোলে কেন আমাদের চলে যেতে হলো। যুক্তি যেখানে কেবল কোনো ধারণা বিশ্লেষণ করে, গল্প সেখানে আমাদের সেই ধারণার ভেতর বাঁচতে শেখায়। এই গল্পই মানুষকে অন্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের অনুভূতি মেলাতে সাহায্য করে। আদি পিতা আদম ও হাওয়া কিংবা ইথাকার রাজা ওডিসিউস কেবল অতীতের চরিত্র নন, তারা মানুষের প্রলোভন ও দীর্ঘ বিচ্ছেদের চিরন্তন প্রতিচ্ছবি।

গল্পের এই অভ্যন্তরীণ শক্তিকে বিভিন্ন যুগে তাত্ত্বিকরা নানাভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পোয়েটিক্স’ গ্রন্থে কাহিনি, চরিত্র, বিপর্যয় ও ক্যাথারসিসের মতো বিষয়গুলো ভেঙে দেখিয়েছেন। পরবর্তীতে জোসেফ ক্যাম্পবেল পুরাণের পুনরাবৃত্ত নকশা খুঁজে বের করেন, যা আধুনিক যুগে এসে জর্জ লুকাশ তাঁর ‘স্টার ওয়ার্স’ চলচ্চিত্রে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সেখানে তলোয়ারের জায়গা নিয়েছে লাইটসেবার আর রাজ্যের বদলে এসেছে গ্যালাক্সি, কিন্তু নায়কের চরিত্রটি রয়ে গেছে অপরিবর্তিত। এরপর গল্প বলার কৌশল আরও পদ্ধতিগত রূপ নেয়। সিড ফিল্ডের তিন অঙ্ক, স্নাইডারের ১৫টি বিট কিংবা হারমনের আট ধাপের বিন্যাসে গল্প হয়ে ওঠে শৃঙ্খলিত কারুশিল্প। রবার্ট ম্যাকি একে একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখলেও গল্পের ভেতরের রহস্য কখনো হারিয়ে যায়নি।

আধুনিক বিশ্বে হলিউড গল্পকে একটি বিশাল শিল্পে রূপান্তর করেছে এবং বিজ্ঞাপন একে বাজারের ভাষায় রূপ দিয়েছে। মানুষ এখন কেবল পণ্য কেনে না, বরং পণ্যের মোড়কে একটি সুন্দর জীবনের গল্প কেনে। রাষ্ট্র, সমাজ, বাজার ও রাজনৈতিক দলগুলোও নিজস্ব আখ্যান তৈরি করে বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তবে ইন্টারনেটের এই যুগে গল্পের প্রধান শত্রু এখন আর বিস্মৃতি বা হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং গল্পের অতিপ্রাচুর্য। আজ পৃথিবীতে গল্পের অভাব নেই, অভাব কেবল মানুষের মনোযোগের। তাই হোমারের প্রথম পঙ্‌ক্তি, ‘মবি-ডিক’ উপন্যাসের ‘কল মি ইসমাইল’ কিংবা রুমির বাঁশির সুরের মতো ‘হুক’ বা আকর্ষণীয় সূচনা এখন আরও বেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। বর্তমানের ‘ডিজিটাল পোলিস’ তথা ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো মাধ্যমে এখন হাজার হাজার গল্পের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।

এই ডিজিটাল পরিবেশের আসল শাসক হলো অ্যালগরিদম। এটি আমাদের পছন্দ পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী কনটেন্ট নির্ধারণ করে দেয়। ফলে মানুষ ও মেশিনের মধ্যে এক অদ্ভুত সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ গল্প তৈরি করছে আর অ্যালগরিদম দেখছে কোন গল্পটি দর্শককে ধরে রাখতে পারছে। এই তথ্য আবার নতুন গল্পের কাঠামো তৈরিতে প্রভাব ফেলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। এআই এখন একই গল্পের শত শত সংস্করণ তৈরি করতে পারে, ভাষা ও চরিত্র বদলে দিতে পারে। ফলে প্রশ্নটি এখন আর এআইয়ের গল্প লেখার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রশ্ন হলো—অসংখ্য গল্পের এই ভিড়ে কোন গল্পটি আমাদের কাছে পৌঁছাবে এবং কে সেটি বেছে দেবে। এই ‘কগনিটিভ স্টোরিটেলিং’ মানুষের স্মৃতি ও যৌথ বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে, যা একসময় রাষ্ট্র বা ধর্ম করত, এখন তা এআইয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিভেদে আলাদা গল্পে রূপ নিচ্ছে। এতে আমাদের যৌথ সামাজিক বাস্তবতা হুমকির মুখে পড়ছে।

এই পরিবর্তনের যুগেও ওডিসিউসের গল্পটি এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। আজকের দিনে সমুদ্রের দানব সাইক্লপস হয়তো রূপ নিয়েছে অ্যালগরিদমে, সাইরেনের মিষ্টি সুরের জায়গা নিয়েছে ফোনের নোটিফিকেশন আর গোলকধাঁধা হয়ে উঠেছে তথ্যের অসীম জাল। তবে প্রাচীন নায়কেরা যেমন যাত্রা শেষে ঘরে ফিরে আসতেন, আধুনিক মানুষের পক্ষে আর পুরোপুরি ফিরে আসা সম্ভব হয় না। প্রতিনিয়ত আমাদের পেশা, প্রযুক্তি ও সামাজিক বাস্তবতা বদলে যাচ্ছে। তাই আমাদের গল্পগুলোর কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি থাকে না, বরং থাকে নতুন ‘আপডেট’। ধারাবাহিক নাটক, পডকাস্ট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত জীবন আজ এক অসমাপ্ত গল্পে পরিণত হয়েছে। গল্পের এই অসীম গোলকধাঁধার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে মানুষ আজও সেই আদিম প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে—সে কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে এবং তার আসল ঘরটি আসলে কোথায়।

হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ‘দ্য ওডিসি’ প্রায় ২৮০০ বছরের পুরোনো। ব্লেক স্নাইডারের ‘সেভ দ্য ক্যাট!’ প্রকাশিত হয়েছে ২০০৫ সালে। ড্যান হারমনের ‘স্টোরি সার্কেল’ আরও সাম্প্রতিক। তবু এই তিনটির নিচে একই নকশা দেখা যায়: মানুষ পরিচিত জগৎ ছেড়ে যায়, অজানার মুখোমুখি হয় এবং ফিরে আসে পরিবর্তিত হয়ে। হাজার হাজার বছর ধরে আমরা নতুন গল্প লিখেছি, কি

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

মেসির বিদায়ী ম্যাচে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ

বেনিনের বিপক্ষে বুধবার ভোরে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা। ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির বিদায়ী এই ম্যাচকে ঘিরে…

3 minutes ago

আগে ফ্যাসিস্টদের বিচার, পরে জাতীয় পুনর্মিলন: ডেপুটি স্পিকার

বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, জুলাই-আগস্টের গণহত্যাকারী…

3 minutes ago

অতীত পেরিয়ে নতুন বছরে মোনালিসা, জন্মদিনে জানালেন কৃতজ্ঞতা

ছোটপর্দা ও মডেলিংয়ের একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় তারকা মোজেজা আশরাফ মোনালিসা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী। সোমবার নিজের…

5 minutes ago

বোমা হামলার হুমকি পেল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, তদন্তে গোয়েন্দারা

রাজধানীর বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা হামলার হুমকি দিয়ে একটি ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় বাড্ডা…

8 minutes ago

পঞ্চগড়ে স্কুল ফিডিংয়ের দুধ খেয়ে ৩৬ শিক্ষার্থী হাসপাতালে

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির দুধ পানের পর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৬ জন শিক্ষার্থী…

14 minutes ago

একই দিনে জন্মদিন: মাশরাফি ও ইমরান খানের ক্রিকেটীয় মিল

৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন দুই দেশের দুই কিংবদন্তি ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা ও ইমরান খান।…

16 minutes ago

This website uses cookies.