মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাত এখন আর কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব এসে পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত, নাফ নদ, বঙ্গোপসাগর এবং বিশেষ করে টেকনাফের ওপর। দিন দিন টেকনাফ একটি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। অথচ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগসেতু হিসেবে টেকনাফের রয়েছে বিশাল আঞ্চলিক কানেকটিভিটি ও ভূ-অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে চলমান লড়াইয়ের কারণে এই কৌশলগত গুরুত্বকে কাজে লাগানো এবং টেকনাফকে সংঘাতের ছায়া থেকে মুক্ত রাখা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাবেক আরাকান ও বর্তমান রাখাইন রাজ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মূল আবাসভূমি। বর্তমানে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। রাখাইনে এই দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় টেকনাফের সীমান্ত এলাকায় অনবরত গোলাবর্ষণ ও বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, জুলাই ২০২৬-এ মংডু ও বুথিডং এলাকায় বিমান হামলার খবর আসার পর বাংলাদেশ সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়। একই সঙ্গে নতুন করে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের চেয়ে আরাকান আর্মি যে এখন অনেক বেশি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশি জেলেদের আটক ও পরবর্তী প্রত্যাবাসনের ঘটনাগুলোতে। আরাকান আর্মির হাতে বিভিন্ন সময়ে আটক হওয়া বাংলাদেশি জেলেদের বিজিবির উদ্যোগে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে ২৪ জন জেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সীমান্ত এলাকা থেকে মোট ৪৩৪ জন জেলে আটক হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ২২২ জনই ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। একদিকে দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট সামাল দেওয়া এবং অন্যদিকে রাখাইনের সংঘাতের সরাসরি প্রভাব থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে নিরাপদ রাখা। সীমান্তে নতুন করে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর পাশাপাশি নাফ নদ ও উপকূলীয় এলাকায় বাংলাদেশি জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থানীয় জনগণের সুরক্ষা এবং সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। এমতাবস্থায়, মিয়ানমারের আনুষ্ঠানিক সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি রাখাইনের বাস্তব ক্ষমতাকাঠামো অর্থাৎ আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেহেতু ওপারে আরাকান আর্মি বা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান-এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাই সীমান্ত নিরাপত্তা, জেলেদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন, মানবিক সহায়তা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো জরুরি বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। বাংলাদেশকে এখন মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষের সঙ্গেই বাস্তবসম্মত সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা জোরদার করতে হবে। তবে এই যোগাযোগকে কোনো রাজনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি হওয়া উচিত সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে একটি প্রয়োজনভিত্তিক যোগাযোগ। একই সঙ্গে এই আলোচনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের স্বার্থকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ, রাখাইনের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে কেবল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও রোহিঙ্গাদের স্থানীয় প্রশাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
এখানে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরের পর বছর ধরে চলা নিপীড়ন, বাস্তুচ্যুতি ও শরণার্থী জীবনের কারণে রোহিঙ্গারা যে মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে, তা অনস্বীকার্য। তবে কেবল ত্রাণনির্ভর জীবন তাদের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করতে পারে না। রোহিঙ্গাদের মধ্যে এমন নেতৃত্ব, গবেষক ও দক্ষ আলোচক গড়ে তোলা প্রয়োজন, যারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বাংলাদেশ, মিয়ানমার সরকার এবং রাখাইনের স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যৌক্তিকভাবে নিজেদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে পারবেন। রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কেবল 'বাংলাদেশ কতজনকে আশ্রয় দেবে' এই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, রাখাইনে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে এবং সেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সংলাপে তারা নিজেরা কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদে টেকনাফের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই কেবল রোহিঙ্গা সংকটে আচ্ছন্ন থেকে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত ও ভূঅর্থনৈতিক কানেকটিভিটির সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। টেকনাফের সামনে থাকা বঙ্গোপসাগর হলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রবেশদ্বার। রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই ভৌগোলিক অবস্থান আঞ্চলিক বাণিজ্য, নৌ-যোগাযোগ ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনার মূল শর্তই হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যে বিষয়ে বাংলাদেশকে অনমনীয় অবস্থান নিতে হবে। নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটিকে পরস্পরের বিকল্প না ভেবে পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি রাখাইনের সংঘাত থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখার নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে এবং অতীতের ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করতে হবে। টেকনাফের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ধরে রাখতে এখন থেকেই সীমান্ত, সামুদ্রিক, মানবিক ও জিওইকোনমিক সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
জুলাই আন্দোলনে ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যা মামলায় আদালতে শুনানির সময় হাতকড়া পেছনে পরানো এবং লিফট…
সিলেটের বিশ্বনাথে বিএনপি'র দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪…
মাদারীপুরের শিবচরে জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণ অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ইলিশ…
ঢাকার ব্যস্ত সড়কে নারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে চালু হয়েছে বিশেষ রাইড…
ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাবনায় মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে…
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বিস্ফোরক মামলায় পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের পদচ্যুত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা তৌহিদুল ইসলাম ফিরোজকে…
This website uses cookies.