Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

ঢাকার রাস্তায় নারী চালকের মোটরসাইকেলে নারী যাত্রী, স্বস্তি দিচ্ছে ‘মায়া রাইড’

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে যানজটের চিরচেনা রূপ। এর মধ্যেই নিরাপদে ও স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে নারীদের জন্য এক অভিনব সমাধান নিয়ে এসেছে ‘মায়া রাইড’। ‘উইমেন-ফার্স্ট রাইড সার্ভিস’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই উদ্যোগে চালক ও যাত্রী—উভয়ই নারী। অপরিচিত পুরুষের পেছনে মোটরসাইকেলে চড়ে যাতায়াতের অস্বস্তি দূর করতেই মূলত এই সেবার সূচনা হয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ফাহাদ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের হাত ধরে শুরু হয় ‘মায়া’। প্রথমে ফেসবুকে পরীক্ষামূলক প্রচারণার মাধ্যমে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে তাঁরা এই উদ্যোগটি গড়ে তোলেন। শুরুতে শুধু মোটরসাইকেল সেবা দিয়ে যাত্রা করলেও, বর্তমানে মায়ার অধীনে প্রাইভেট কার ও কার-শেয়ারিংয়ের সুবিধাও যুক্ত হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় নারী চালকের সংখ্যা কম হওয়াই এখন এই উদ্যোগের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

মায়া রাইডের তেমনই একজন চালক বা ‘মায়াবী’ হলেন সাথী (ছদ্মনাম)। ছয় বছরের মেয়ের দেখাশোনা ও সংসারের কাজ সামলে অবসর পেলেই মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তিনি। গত জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ৩৮টি রাইড দিয়েছেন সাথী। বাসে যাতায়াতের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং অটোরিকশায় অসুস্থ বোধ করার কারণে নিজের যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল বেছে নিয়েছিলেন তিনি। পরে অন্য নারীদের জন্য বিকল্প তৈরি করতে মায়ায় যোগ দেন। সাথী বলেন, ‘অপরিচিত কোনো পুরুষের সঙ্গে রাইড শেয়ার করতে না চাইলেও অনেক নারীর বিকল্প থাকে না। সেই বিকল্পটা তৈরি করার তাগিদ থেকেই মায়ায় যোগ দিই।’ প্রথম রাইডের দিন কিছুটা ভয় থাকলেও যাত্রীর ইতিবাচক কথা তাঁর সেই ভয় দূর করে দেয়। এই কাজে স্বামীর পূর্ণ সমর্থন তাঁর বড় শক্তি বলে জানান তিনি।

মায়ার নিয়মিত যাত্রীদের একজন দক্ষিণ বনশ্রীর বাসিন্দা আনিকা সালসাবিল, যিনি নিয়মিত ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে যাতায়াত করেন। আগে অটোরিকশায় যাতায়াত করলেও এখন স্বস্তির জন্য মায়ার সেবা নিচ্ছেন তিনি। আনিকার মতে, ‘নারী চালক থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বস্তি। পুরো পথ নিশ্চিন্তে থাকা যায়। অফিসে তাড়া থাকলে মোটরসাইকেলে দ্রুত পৌঁছানোও সম্ভব।’ তবে নিজস্ব অ্যাপ না থাকায় ফেসবুক বা ফোনে আগে যোগাযোগ করতে হয় বলে জানান তিনি।

মায়ার হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬০০টির বেশি রাইডের অনুরোধ এসেছে, যার মধ্যে ৪০০টির বেশি সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮টি রাইড হচ্ছে। চালকসংকটের কারণে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুরোধ পূরণ করা সম্ভব হয় না। মায়ার নিয়মিত মোটরসাইকেল সেবা নিচ্ছেন ১০ জনের বেশি নারী, যাদের কেউ সপ্তাহে ৩-৪ দিন আবার কেউ অফিসে যাতায়াতের জন্য ১০টি পর্যন্ত রাইড বুক করেন। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও বসুন্ধরা এলাকায় এই সেবার চাহিদা সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে সকালের অফিসের সময়ে।

বর্তমানে মায়ার কোনো নিজস্ব অ্যাপ নেই, তবে অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন ফাহাদ চৌধুরী। আপাতত সেবাটি পেতে যাত্রীদের ১ থেকে ২ ঘণ্টা আগে ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ বা ফোনে বুকিং দিতে হয়। রাইডার নিশ্চিত হলে দুই পক্ষকে একে অপরের নম্বর দেওয়া হয়। তবে যাত্রী নামানোর পর চালকদের অনেক সময় খালি গাড়ি নিয়ে ফিরতে হয় বলে দূরের রাইড নিতে চান না অনেকে।

মায়ায় চালক হিসেবে যুক্ত হতে জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ট্যাক্স টোকেনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রয়োজন হয়। মায়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, চালক হতে আগ্রহী নারীদের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক বাইক ব্যবহার করেন, যাদের অনেকের বিআরটিএ অনুমোদিত লাইসেন্স বা বৈধ কাগজপত্র নেই। এ কারণে ২০ থেকে ৩০ জন আগ্রহী নারীকে যুক্ত করা যায়নি। এ ছাড়া পারিবারিক বা সন্তানের অসুস্থতার কারণে অনেকে নিয়মিত রাইড দিতে পারেন না।

মায়া রাইড এখন শুধু মোটরসাইকেল বা কার সেবায় সীমাবদ্ধ নেই, স্কুলগামী শিশুদের জন্য চালু করেছে ‘মায়া কিডস’ ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম। মাসিক প্যাকেজের আওতায় প্রিবুকিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের নিরাপদে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া ও ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা রয়েছে এতে, যেখানে পরিবারের একজন সদস্যও সঙ্গে যেতে পারেন।

মায়ার সেবা বর্তমানে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বসুন্ধরা, বারিধারা ও পুরান ঢাকায় চালু রয়েছে। রাত নয়টা পর্যন্ত এই সেবা দেওয়া হয়। মোটরসাইকেলের প্রতি রাইডে ১০ শতাংশ এবং প্রাইভেট কারে ১৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়। কার-শেয়ারিং সেবায় বর্তমানে ৪টি গাড়িতে ১৫ জন চাকরিজীবী নারী মাসিক চুক্তিতে যাতায়াত করছেন। চালক ও যাত্রীদের জন্য এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিমা নেই। খারাপ আবহাওয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা মনে হলে চালকদের রাইড বাতিলের সুযোগ রয়েছে। জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আগামী এক বছরে আরও অনেক দক্ষ, পেশাদার ও ভেরিফায়েড নারী চালককে রাজপথে দেখতে চাই। নারীদের স্বস্তিতে চলাচলের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি তাঁদের আয়ের পথ তৈরি করাই মায়ার লক্ষ্য।’

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে বিধবার টিপসই নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক বিধবার টিপসই নিয়ে জালিয়াতি করে বিয়ের কাবিননামা…

2 minutes ago

মাধবপুরে দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভা

আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে হবিগঞ্জের মাধবপুরে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলা…

8 minutes ago

ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে ভুয়া তথ্যবিরোধী সম্মেলন থেকে সরে গেল ইইউ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের চাপের মুখে ইউরোপের ভুয়া তথ্য ও অপতথ্য মোকাবিলাবিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ…

10 minutes ago

আদালতে হাতকড়া ও সিঁড়ি ব্যবহার নিয়ে পলকের ক্ষোভ

জুলাই আন্দোলনে ট্রাকচালক মো. হোসেন হত্যা মামলায় আদালতে শুনানির সময় হাতকড়া পেছনে পরানো এবং লিফট…

38 minutes ago

বিশ্বনাথে দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি

সিলেটের বিশ্বনাথে বিএনপি'র দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪…

42 minutes ago

ইলিশ সম্পদ রক্ষায় জেলেদের ধৈর্য ধরার আহ্বান প্রতিমন্ত্রীর

মাদারীপুরের শিবচরে জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণ অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ইলিশ…

47 minutes ago

This website uses cookies.