পাবলো নেরুদার স্মৃতিতে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ছিলেন এমন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি তাকে অন্য যেকোনো মানুষের চেয়ে বেশি হাসাতে পারতেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই মানুষটিই সবাইকে এক শতাব্দীর গভীর শোকে ভাসিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। লোরকার মৃত্যুর যেন এক অদ্ভুত পূর্বাভাস লুকিয়ে ছিল নেরুদার কবিতায়। আবার লোরকা নিজেও যেন নিজের শেষ পরিণতি কোনো এক অজানা ভাষায় আগে থেকেই টের পেয়েছিলেন। তাদের এই বন্ধন কেবল দুই কবির বন্ধুত্বের গল্প নয়; এর ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে স্পেনের উত্তাল ইতিহাস, ফ্যাসিবাদের উত্থান, গৃহযুদ্ধের কালো ছায়া, প্রেম ও যৌনতার সামাজিক ট্যাবু এবং কবিতার সেই রহস্যময় ক্ষমতা, যা ভবিষ্যৎকে বর্তমানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
১৯৩৪ সালের এক সকালে লোরকা নেরুদাকে একটি অদ্ভুত ঘটনার কথা শুনিয়েছিলেন। ‘লা বারাকা’ নাট্যদলের সঙ্গে কাস্তিলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘোরার সময় এক রাতে লোরকার ঘুম আসছিল না। ভোরে তিনি একা হাঁটতে বের হয়ে একটি পুরোনো জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষের ফটকে পৌঁছান। সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের ফ্যাকাশে আলোয় হঠাৎ একটি ছোট মেষশাবক হাজির হয়, যা ছিল যেন এক টুকরো দেবদূত। কিন্তু পরক্ষণেই সেখানে ধেয়ে আসে কয়েকটি ক্ষুধার্ত, আধা-বন্য কালো শূকর। লোরকার চোখের সামনেই তারা নিরীহ মেষশাবকটিকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে। এই ঘটনার ঠিক তিন মাস পর স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। লোরকার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর নেরুদা যখন এই স্মৃতির দিকে ফিরে তাকান, তখন তার মনে হয়েছিল লোরকা আসলে নিজের মৃত্যুরই একটি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ দেখে ফেলেছিলেন—যেখানে নিরীহ লোরকা ছিলেন সেই মেষশাবক আর তার হত্যাকারীরা ছিল সেই হিংস্র কালো পশুর দল।
এই দুই মহান কবির প্রথম দেখা হয়েছিল ১৯৩৩ সালের ১৩ অক্টোবর, বুয়েনস আয়ার্সে পাবলো রোহাস পাস ও সারা তর্নুর বাড়ির একটি সাহিত্যিক সমাবেশে। লোরকা তখন এসেছিলেন তার বিখ্যাত নাটক ‘ব্লাড ওয়েডিং’-এর লাতিন আমেরিকান মঞ্চায়নের জন্য, আর নেরুদা সেখানে অবস্থান করছিলেন চিলির কনসাল হিসেবে। এর এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই, ১০ নভেম্বর বুয়েনস আয়ার্সের প্লাজা হোটেলে তাদের সম্মানে একটি ভোজসভার আয়োজন করা হয়। সেই রাতে তারা দুজনে মিলে রুবেন দারিওকে স্মরণ করে এক অভিনব যৌথ বক্তৃতা দেন। স্প্যানিশ ষাঁড়ের লড়াইয়ে দুই মাতাদোরের একই চাদর ধরে একটি ষাঁড়ের মুখোমুখি দাঁড়ানোর কৌশলের মতো, তারা একে অন্যের বাক্য ধরে ধরে এক সুরে কথা বলে যান। সেই রাতেই তাদের বন্ধুত্বের ভেতর জন্ম নেয় এক গোপন ভাষা ও খেলার জগৎ।
বুয়েনস আয়ার্স ছাড়ার আগে তারা তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া সারা তর্নুর জন্য একটি বিশেষ স্মারক তৈরি করেন। ‘পালোমা পোর দেএন্ত্রো/লা মানো দে বিদ্রিও/ইন্তেরোগাতোরিও/ভারিয়াস এস্তানসাস’ নামের এই বইটিতে স্থান পায় নেরুদার কবিতা আর লোরকার আঁকা ছবি। বইটির একটি ছবিতে দেখা যায় দুজনের বিচ্ছিন্ন মাথা। লোরকার নির্মম হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস জানার পর আজ সেই ছবির দিকে তাকালে এক শিউরে ওঠা ভবিষ্যৎবাণী যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৩৪ সালের বসন্তে লোরকা স্পেনে ফিরে আসেন এবং নেরুদাও দ্রুতই সেখানে পৌঁছান। স্পেনে পা রেখে নেরুদা সেখানকার ‘১৯২৭-এর প্রজন্ম’-এর কবিদের উষ্ণ সান্নিধ্য পান, যারা স্প্যানিশ সাহিত্যের স্বর্ণযুগকে আধুনিকতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন রূপ দিচ্ছিলেন। এই সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে বোহেমিয়ান নেরুদার আগমন অনেক পুরোনো রীতিনীতিকে নাড়া দিয়েছিল। কবি জুয়ান রামোন হিমেনেস তাকে কিছুটা বিরক্তি ও বিস্ময় নিয়ে ‘একজন মহান খারাপ কবি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। নেরুদার বন্ধুরা তাকে নিয়ে প্রায়ই নানা দুষ্টুমি করতেন, যার অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন লোরকা। গভীর রাতে ফোনে গান গেয়ে নেরুদাকে জাগানো, মদ ঢালা, লোরকার গান আর নেরুদার ভূতের পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে তাদের হাসির ফোয়ারা ছুটত। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে হাসিই ছিল তাদের অন্যতম প্রতিরোধ।
লোরকা ছিলেন এমন এক মানুষ, যাকে ঘিরে সব সময় আনন্দের উৎসব লেগে থাকত। পেদ্রো সালিনাস লিখেছিলেন, লোরকার চারপাশে সবসময় মানুষের ভিড় থাকত কারণ তিনি নিজেই ছিলেন এক জীবন্ত উৎসব। নেরুদার চোখে লোরকা ছিলেন প্রতিভা ও অনুগ্রহের এক আশ্চর্য সমন্বয়, একটি ডানাওয়ালা হৃদয় ও স্বচ্ছ জলপ্রপাত। ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট নেরুদার কন্যা মালভা মারিনার জন্মের সময় নেরুদা যখন নিজের মৃত্যুর আশঙ্কায় ভুগছিলেন, তখন লোরকা সেই নবজাতকের জন্য একটি সুন্দর কবিতা লিখেছিলেন।
কিন্তু এই আনন্দের দিনগুলো বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৩৬ সালের ১৯ জুলাই রাতে মাদ্রিদের প্রাইস গ্র্যান্ড সার্কাসে এক বিচিত্র কুস্তি প্রদর্শনীর আসরে তাদের দেখা করার কথা ছিল। নেরুদা সেখানে অপেক্ষা করলেও লোরকা আর আসেননি। তিনি ততক্ষণে নিজের ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। দুই বন্ধুর আর কোনোদিন দেখা হয়নি। এর কয়েক দিন পরেই স্পেনে গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। নেরুদার কবিতা চিরতরে বদলে যায়। নেরুদার নিজের ভাষায়, তার কাছে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মূলত একজন কবির আকস্মিক অন্তর্ধানের মধ্য দিয়েই।
নরসিংদীর বেলাবোতে নিলক্ষিয়া পূর্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রটি পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন…
বড় পর্দায় নিজের অবস্থান শক্ত করতে চান অভিনেত্রী সাবিলা নূর। কাজের সংখ্যার চেয়ে গল্পের মান…
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া এলাকায় পাউবোর ওয়াপদা বেড়িবাঁধ ধসে গেছে। এতে ১০ থেকে…
পশ্চিম তীরের রামাল্লায় অবস্থিত নেদারল্যান্ডসের মিশনের কর্মীদের কূটনৈতিক মর্যাদা বাতিলের প্রতিবাদে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত জভি আভিনের…
সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগে আটক চার জেলেকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।…
চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস ও চিত্রনায়ক শাকিব খানের একমাত্র সন্তান আব্রাম খান জয়ের ১০ বছরে পদার্পণ…
This website uses cookies.