প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭: ৪৬
স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে এবং রক্তপাতহীন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বে ‘পদত্যাগের নৈতিক সংস্কৃতি’ গড়ে তোলা প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রভুদের কোনো অসাংবিধানিক ও বেআইনি নির্দেশের মুখোমুখি হয়ে দাসত্ব না করে বাহিনী প্রধান বা শীর্ষ কর্মকর্তারা যদি পদত্যাগের মতো চূড়ান্ত নৈতিক অবস্থান নেন, তবে স্বৈরাচারের তাসের ঘর এক মুহূর্তেই ধসে পড়তে বাধ্য। রাজপথে একটি তাজা প্রাণ ঝরার আগেই থেমে যাবে রক্তবন্যা। গত ২৯ আগস্ট রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনে (রাওয়া) আয়োজিত ‘জাতীয় ঐক্য : সংলাপ ও সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনারে সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের এই নৈতিক সংস্কৃতির ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেন সাবেক সহকারী নৌবাহিনীপ্রধান ও বিইউপি’র উপ-উপাচার্য।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, রাজনীতিবিদদের প্রচলিত প্রক্রিয়ায় জাতীয় স্বার্থের অভিন্ন বিন্দুতে ঐক্যবদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব। ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথের স্যার নিনিয়ান স্টিফেন থেকে শুরু করে ২০১৩ সালে জাতিসংঘের ফার্নান্দেজ তারানকো—আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার বহু চেষ্টা রাজনীতিকদের চরম অনাস্থা আর অনমনীয়তায় ব্যর্থ হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সংলাপের উদ্যোগগুলোও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থপরতার চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে। এই তিক্ত বাস্তবতা প্রমাণ করে, যখন রাজনীতির মঞ্চ ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রকে চরম ধ্বংস আর রক্তপাত থেকে বাঁচাতে প্রয়োজন হয় প্রথাভাঙা, আপসহীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ।
বাঙালি জাতির ইতিহাস যেমন বীরত্বের, তেমনই এক আত্মঘাতী চক্রে বন্দি। চরম সংকটকালে রাজপথে রক্ত দিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, যার প্রমাণ ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রাম বা ২০২৪ সালের রক্তস্নাত আগস্ট বিপ্লব। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, রাজপথের লাশ আর বিপ্লবের বারুদ শান্ত হতে না হতেই দেশ গড়ার শপথ পেছনে ফেলে শুরু হয় ক্ষমতার নির্লজ্জ ভাগবাটোয়ারা। স্বৈরাচার আর ফ্যাসিবাদের বিষদাঁত ভাঙতে কেন প্রতি প্রজন্মে তরুণদের বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হতে হবে? রাজনীতিকদের যেখানে সহজে এক টেবিলে বসানো যায় না, সেখানে স্বৈরাচার রুখতে এবং রক্তপাত বন্ধ করতে সবচেয়ে কার্যকর ও মানবিক পথ হলো শীর্ষ সামরিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের ‘পদত্যাগের নৈতিক সংস্কৃতি’।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক থেকে শুরু করে ১৯৪৭-পরবর্তী পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের ‘নন-মার্шал রেস’ বা ‘অযুদ্ধংদেহী জাতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। তবে আমাদের লড়াকু রক্তকে কখনো মুছে ফেলা যায়নি। ১৯৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধে লাহোরের রণাঙ্গনেভারতীয় বাহিনীকে রুখে দিয়ে নিজেদের শৌর্যবীর্যের প্রমাণ দিয়েছিল অপরাজেয় প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, যারা ‘ডিফেন্ডার অব লাহোর’ নামে পরিচিত। সেই অদম্য প্রতিরোধই পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। দেশের সামরিক বাহিনীর ধমনিতে প্রবাহিত এই দেশপ্রেমিক শক্তির আপসহীন নৈতিক অবস্থানই যেকোনো আধিপত্যবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারে।
আঞ্চলিক বাস্তবতায় ভারত বা পাকিস্তানের সরকারগুলো সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও চেইন অব কমান্ডে নগ্ন হস্তক্ষেপ থেকে অনেকটাই বিরত থেকেছে। অথচ ২০০৯ সালের বিডিআর ট্র্যাজেডির দিন থেকেই আমাদের সেনাবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। তবে ইতিহাস সাক্ষী, ২০২৪ সালের আগস্টে সেই সেনাবাহিনী জনগণের আকাঙ্ক্ষার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল বলেই ফ্যাসিবাদের পতন সম্ভব হয়েছিল। গত দেড় দশকে রাজনৈতিক স্বার্থে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে এক অন্ধকারতম অধ্যায়। রাজনৈতিক প্রভুদের তুষ্ট করতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বলপ্রয়োগজনিত গুম। কতিপয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অন্ধ আজ্ঞাবহতার কারণে আজ বহু জুনিয়র অফিসারকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, এমনকি অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি। পতিত স্বৈরাচারের সহযোগী একাধিক জেনারেল আজ পালিয়ে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, যা চরম জাতীয় লজ্জা। একই সঙ্গে সাবেক দুই সেনাপ্রধান আজ আত্মগোপনে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মুখোমুখি হওয়ার মতো চরম অপমানের মুখে পড়েছেন।
এই ঐতিহাসিক সংকট থেকে স্থায়ী উত্তরণ ও কার্যকর জাতীয় ঐক্য গঠনে দুটি মৌলিক প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম প্রস্তাবনা হলো, পদত্যাগের নৈতিক সংস্কৃতি ও আপসহীন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কারণে কোনো বেআইনি বা মানবাধিকারবিরোধী আদেশ দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। যদি কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এমন অবৈধ নির্দেশ চাপিয়ে দেন, তবে জুনিয়র কর্মকর্তাদেরও সেই বেআইনি আদেশ তামিল করতে অস্বীকার করতে হবে এবং পদত্যাগের হুমকি দিয়ে নৈতিক অবস্থান নিতে হবে। ভারতের সামরিক ইতিহাস এর বড় নজির। দেশটির প্রথম কমান্ডার-ইন-চিফ ফিল্ড মার্শাল কে এম কারিয়াপ্পা ১৯৪৯ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে দাঁড়িয়েও পদত্যাগের অনড় অবস্থান নিয়ে সেনাবাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখেছিলেন। এই আপসহীন নীতিবোধের কারণে অবসরের ৩৩ বছর পর, ১৯৮৬ সালে ৮৭ বছর বয়সে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ পাঁচ-তারকা ফিল্ড মার্শাল পদমর্যাদায় ভূষিত করা হয়। একইভাবে ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ ১৯৭১ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর তাৎক্ষণিক যুদ্ধ ঘোষণার চাপের মুখে পেশাদার সামরিক যুক্তি তুলে ধরে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই আপসহীন অবস্থানের ফলেই পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি সম্ভব হয়েছিল এবং ডিসেম্বরে অর্জিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বিজয়, যার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৩ সালে তিনি দেশটির প্রথম ফিল্ড মার্শাল পদে ভূষিত হন।
পদত্যাগের নৈতিক শক্তি আমাদের নিজেদের ইতিহাসেও রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে guerrilla বাহিনীকে সুসংগঠিত করে যিনি স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছিলেন, সেই সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী ক্ষমতার মোহ উপেক্ষা করে নীতিতে অবিচল থাকার অনন্য প্রতীক ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বেসামরিক নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক পথচ্যুতি এবং ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রতিবাদে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংসদ সদস্য পদ ও ক্ষমতাসীন দল থেকে পদত্যাগের মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নীতির প্রশ্নে আপস না করে পদত্যাগের এমন মেরুদণ্ডসম্পন্ন দৃষ্টান্ত আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।
দ্বিতীয় প্রস্তাবনা হলো, পরবর্তী প্রজন্মের আপসহীন ও আত্মমর্যাদাশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলা। অতীতে চেইন অব কমান্ড ভেঙে কতিপয় উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তা রাজনৈতিক পদলেহন করেছেন, ক্ষমতার মসনদ বাঁচাতে সহকর্মীদের বিপদে ফেলেছেন এবং দিনশেষে কলঙ্কিত হয়ে পালিয়েছেন। ২০২৪ সালের বিপ্লবোত্তর নতুন বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনীতে আর কোনো মীরজাফর বা আত্মমর্যাদাহীন চাটুকারের ঠাঁই হতে পারে না। আমাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে হতে হবে বঙ্গবীর ওসমানীর যোগ্য উত্তরসূরি। ভবিষ্যতে দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে যদি কোনো বাহিনীপ্রধান বা শীর্ষ কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভুদের বেআইনি ও জনবিরোধী আদেশের দাসত্ব না করে জাতীয় স্বার্থে মাথা উঁচু করে পদত্যাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন, তার সেই অদম্য নৈতিক সাহস ও দেশপ্রেমের প্রতি সমগ্র কৃতজ্ঞ জাতি জানাবে উষ্ণ ‘অগ্রিম স্যালুট’ এবং ইতিহাস তাকে ভূষিত করবে জাতীয় বীরের চিরন্তন সম্মানে।
ইসলামে ইবাদতের একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত থেকে বাঁচতে নিয়তের…
নাটোরের গুরুদাসপুরে অন্যের জমিতে ১২ বছর ধরে বসবাস করা এক দিনমজুরের পরিবারকে তিন মাসের মধ্যে…
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে পাকিস্তানের সাবেক…
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী। বৃহস্পতিবার…
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্র কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে নবীনবরণ ও প্রবীণ বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।…
কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬২৪ জনকে আটক…
This website uses cookies.