Header Premium (728×90)

হান কাংয়ের ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’: শরীর ও স্বাধীনতার এক নীরব আখ্যান

কখনো কখনো মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ছোট কোনো ঘটনা পুরো জীবনের অর্থ বদলে দেয়। হান কাংয়ের ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ উপন্যাসের শুরুটা হয় এমনই এক ভোরে, যেখানে ইয়ং-হে-র স্বামী তার স্ত্রীকে রান্নাঘরে ফ্রিজের সাদা আলোয় স্বপ্নের ঘোরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। মাংস খাওয়া বন্ধ করার এই সিদ্ধান্তটি উপন্যাসে কেবল খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি দরজা, যা খুলে গেলে বেরিয়ে আসে শরীর, পরিবার, ভালোবাসা, পুরুষতন্ত্র, সহিংসতা এবং স্বাধীনতার অন্ধকার দিকগুলো।

ইয়ং-হে-র স্বামী নিজের জীবনকে মেপে রাখা সাধারণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখতে পছন্দ করেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন একজন স্ত্রী যিনি তার জীবন জটিল করবেন না। ইয়ং-হে মাংস খাওয়া ছেড়ে দিলে স্বামী প্রথমে বিরক্ত ও লজ্জিত বোধ করেন, কিন্তু তার পেছনে থাকা কারণটি বোঝার তেমন চেষ্টা করেন না। হান কাং এই গল্পে আমাদের এক অদ্ভুত আয়না দেখান—আমরা কি সত্যিই আমাদের কাছের মানুষদের চিনি, নাকি শুধু আমাদের প্রত্যাশিত আচরণটুকুই তাদের কাছ থেকে খুঁজি? এখানে কোনো রক্তপাত বা দরজা ভাঙার ঘটনা না থাকলেও এক ধরনের অদৃশ্য সহিংসতা বিদ্যমান, কারণ ইয়ং-হে-কে তার নিজের মতো থাকার অধিকার দিতে কেউ রাজি নয়।

ইয়ং-হে-র এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে এক ভয়ংকর স্বপ্ন, যা রক্ত, মাংস ও মৃতদেহ দ্বারা তাড়িত। লেখক খুব সতর্কভাবে কোনো সহজ উত্তর বা চাবি আমাদের হাতে তুলে দেন না। আমরা যখনই তার অতীতের বাবা, শৈশব বা স্বামীর আচরণের মধ্যে উত্তরের সন্ধান করি, গল্পটি মোড় নেয়। সম্ভবত ইয়ং-হে-কে বোঝার জন্য কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই; হয়তো একজন মানুষকে বোঝার সবচেয়ে বড় ভুল হলো তার প্রতিটি আচরণের পেছনে একটি যুক্তি খুঁজতে যাওয়া।

উপন্যাসে ইয়ং-হে ধীরে ধীরে নিজের শরীরের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান, কিন্তু তার বাবা, স্বামী, দুলাভাই এবং চিকিৎসকরা সবাই তার শরীর নিয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে ব্যস্ত। ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’-এর সবচেয়ে গভীর প্রশ্নটি এখানেই—একজন মানুষের শরীরের মালিক কে? সমাজ, পরিবার নাকি সেই ব্যক্তি নিজে? ইয়ং-হে যখন মানুষের পৃথিবী থেকে দূরে সরে গিয়ে ফুলের প্রতি আকৃষ্ট হন, তখন তিনি যেন গাছ হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন, যেখানে কোনো সহিংসতা বা অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই নেই।

বোন ইন-হে এই উপন্যাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যিনি বোনের অদ্ভুত আচরণ না বুঝেও তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই ভালোবাসা যুক্তিহীন এবং গভীর। হান কাংয়ের গদ্য শান্ত ও সরল, কিন্তু তার নিচে বয়ে যায় বরফের নিচের জলের মতো তীব্রতা। শেষ পর্যন্ত উপন্যাসটি আমাদের কোনো সমাধান দেয় না, বরং আমাদের সামনে প্রশ্ন রাখে—একজন মানুষ শেষ পর্যন্ত কতটা নিজের হতে পারে? ইয়ং-হে-র নীরবতা উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠার পরও পাঠকের মনে কুয়াশার মতো জমে থাকে, যা আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব ও অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণের অভ্যাসের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

কৃষি মন্ত্রণালয়ে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ‘আমলনামা’ পর্যালোচনা শুরু

কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থা ও প্রকল্পে কর্মরত বিতর্কিত কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) অতীত…

3 minutes ago

এশিয়ান গেমস কাবাডিতে ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হারল বাংলাদেশ

এশিয়ান গেমসের পুরুষ কাবাডিতে শক্তিশালী ভারতের মুখোমুখি হয়ে বড় ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। জাপানের টোকাই সিটিজেন…

6 minutes ago

মুকসুদপুরে বাসের ধাক্কায় পথচারী নিহত

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গেড়াখোলা ব্রীজ এলাকায় বাসের ধাক্কায় আকরাম বিশ্বাস নামে এক পথচারী…

15 minutes ago

সরকারি দরপত্রে ২০ বছরের ‘সুযোগবঞ্চিত’দের জন্য নতুন সুযোগ

সরকার ‘গণ খাতে ক্রয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে। এর মাধ্যমে গত ২০ বছরে অনুকূল…

20 minutes ago

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত নৈশভোজে সস্ত্রীক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা…

25 minutes ago

টাওয়ার হ্যামলেটসে স্কুল পোশাকের অনুদান বৃদ্ধি, সুবিধা পাবে আরও বেশি পরিবার

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সামলাতে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল স্কুল পোশাক অনুদানের পরিধি বাড়িয়েছে। বার্ষিক…

27 minutes ago

This website uses cookies.