Header Premium (728×90)

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে রোগীদের চরম ভোগান্তি, ১৬ বছরের প্রকল্পেও কাটেনি সংকট

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে উন্নত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসার আশায় এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে ব্যয়বহুল চোখের চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩ থেকে ৪ হাজার রোগীর উপচে পড়া ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একদিনে ডাক্তার দেখানো এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রোগীদের একাধিকবার হাসপাতালে যাতায়াত করতে হচ্ছে। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও হাসপাতালের এই চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।

সরেজমিনে সোম, মঙ্গল ও বুধবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায় রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। হাসপাতালের প্রবেশমুখের তথ্যকেন্দ্রে একজন নারী কর্মী রোগীদের দিকনির্দেশনা দিলেও বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে চিকিৎসকের কক্ষ পর্যন্ত সর্বত্রই দীর্ঘ লাইন। চাঁদপুর সদর উপজেলা থেকে শ্বশুরকে নিয়ে আসা ফয়সাল জানান, তার শ্বশুরের চোখের ছানি অপারেশনের জন্য প্রথম দিন ১০ টাকার টিকিট কেটে অন্য কক্ষে যান। সেখানে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমার কাউন্টারে পৌঁছানোর পর সেদিন আর কোনো কাজ করা সম্ভব হয়নি। এভাবে সাতদিন ধরে যাতায়াত ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরও ভর্তির তারিখ না পেয়ে উল্টো আবারও নতুন টেস্ট দেওয়া হয়েছে।

একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান গাজীপুর থেকে স্বামীর চিকিৎসার জন্য আসা সাহেরা খাতুন। তিনদিন লাইনে দাঁড়িয়ে সব প্রক্রিয়া শেষ করার পর ডাক্তার চোখে ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেই ইনজেকশন দেওয়ার সিরিয়াল পেতে হলে আবার রবিবার বা বুধবার ভোর ৬টায় এসে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তিনি শুনেছেন, দিনে মাত্র পাঁচজনের বেশি রোগীকে এই ইনজেকশন দেওয়া হয় না। কুমিল্লা থেকে আসা আজাদ হোসেন চিকিৎসকদের সেবায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও কিছু কিছু নার্সের আচরণকে চরম অমানবিক বলে উল্লেখ করেন। হাসপাতালের ১১৬ নম্বর কক্ষের সামনে দায়িত্বরত এক নার্সের বিরুদ্ধে একাধিক রোগীর দুর্ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও ওই নার্স কোনো সহযোগিতা না করে রূঢ় আচরণ করেন।

আইএমইডি পরিচালিত ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনে জানা গেছে, হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের প্রকল্পটি ৩ বছরের মেয়াদে ২০০৩ সালে শুরু হয়ে ২০০৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাত দফা সময় বাড়িয়ে ১৬ বছর পর ২০১৯ সালে এটি সম্পন্ন হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় ৮৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৩ কোটি টাকায়। দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও হাসপাতালটিতে এখনো ১৫৪টি চিকিৎসক ও নার্সের পদ শূন্য রয়েছে। বর্তমানে ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ১৮৩ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। নার্সের অনুমোদিত ২৫১টি পদের বিপরীতে কাজ করছেন ২১০ জন। এ ছাড়া হাসপাতালে স্থাপিত ৭০ ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামের মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চমূল্যের যন্ত্র অচল থাকায় রোগীরা গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ইউসুফ অ্যান্ড এসোসিয়েটস নামক একটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত আইএমইডি’র জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৮ শতাংশ রোগী প্রথমবার এসে সেবা পেয়েছেন। বাকিদের চিকিৎসার জন্য একাধিকবার, এমনকি চারবার পর্যন্ত হাসপাতালে আসতে হয়েছে। প্রেসক্রিপশনের সব ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও রোগীরা তা পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি উত্তরণে আইএমইডি হাসপাতালটিকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করা, উন্নত টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা, কর্মীদের আচরণগত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সেবার সময় বাড়িয়ে দুই শিফটে বিকেল ৫টা পর্যন্ত করার সুপারিশ করেছে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ চোখের ছানি অপারেশনের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু প্রতি ৮৩৩ জন অপেক্ষমাণ রোগীর বিপরীতে দেশে মাত্র একজন দক্ষ সার্জন রয়েছেন। দেশে প্রায় ২ হাজার ২০০ জন চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজন এর প্রায় চারগুণ। এ ছাড়া প্রায় ৪০ হাজার অন্ধ শিশুর মধ্যে ১২ হাজার শিশুর চিকিৎসাযোগ্য ছানি থাকলেও তারা এখনো অস্ত্রোপচারের সুযোগ পায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন সার্জনের ওপর গড়ে প্রায় এক হাজার রোগীর দায়িত্ব থাকায় এই বিশাল অপেক্ষমাণ তালিকা কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

বেসরকারি হাসপাতালে যে রেটিনা লেজার অপারেশনে প্রায় এক লাখ টাকা এবং প্রতিটি ইনজেকশনে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়, তা এই সরকারি হাসপাতালে মাত্র ১০ টাকার টিকিটে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এই সাশ্রয়ী সুবিধার কারণেই এখানে রোগীর ভিড় ক্রমাগত বাড়ছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এইচইএম রেজওয়ানুর রহমান সোহেল জানান, বহির্বিভাগে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী আসেন। বহির্বিভাগের চিকিৎসকরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ জন করে রোগী দেখেন এবং প্রয়োজনে জরুরি রোগীদের জন্য অতিরিক্ত ২০ থেকে ৫০ জন রোগীও দেখা হয়। ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তারা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে প্রস্তুত থাকেন এবং নামমাত্র মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ কিছু ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স: ক্ষুধা কমানোর গতি কমে বাংলাদেশ ৮৪তম

২০২৬ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স অনুযায়ী, ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৮৪তম অবস্থানে রয়েছে। সূচকে বাংলাদেশের…

17 minutes ago

বন্দর লিজের আগে জনগণের মতামত নেওয়ার দাবি সাইফুল হকের

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ দেশের লাভজনক স্থাপনা বিদেশি কোম্পানির কাছে লিজ দেওয়ার পদক্ষেপকে আত্মঘাতী…

36 minutes ago

পরিবেশ রক্ষায় কর্মকর্তাদের বাড়তি দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

পরিবেশ ও বন রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরেও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান…

37 minutes ago

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাংলাদেশ সফরসূচিতে প্রস্তুতি ম্যাচের সময় কমল

বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি ম্যাচের সূচিতে পরিবর্তন এনেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল। তিন দিনের পরিবর্তে এখন…

57 minutes ago

প্রশ্নপত্র ফাঁস রুখতে সচিবালয়ে রাত কাটাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক

সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাত কাটাচ্ছেন যুব…

2 hours ago

সালমানের প্র্যাঙ্কে শুটিং সেটে কেঁদে ফেলেছিলেন কারিশমা কাপুর

জনপ্রিয় বলিউড জুটি সালমান খান ও কারিশমা কাপুরের মজার এক স্মৃতি। শুটিং সেটে সালমানের করা…

2 hours ago

This website uses cookies.