Header Premium (728×90)

জ্বালানি সংকট কাটাতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারা। মঙ্গলবার ঢাকা ক্লাবের সামসন এইচ চৌধুরী হলে ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) এ সেমিনারের আয়োজন করে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার রুফটপ সোলারে আগ্রাসীভাবে এগোচ্ছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতির পাশাপাশি পাঁচ বছরের কর অবকাশসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে ক্লাস্টারভিত্তিক ও অপেক্স মডেলে রুফটপ সোলার স্থাপনে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সতর্কতার সঙ্গে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, একটি কোম্পানিকে সুবিধা দিতে নয়, বরং সবাইকে ব্যবসার সুযোগ দিতে নীতি করা হচ্ছে।

ভোলার গ্যাস নিয়ে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। পেট্রোনাসের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও কথা হয়েছে এবং বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফর করেছে। শিল্পে গ্যাস সংকটের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ না থাকলে শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যবসা ও ক্যাশ ফ্লোতে বড় প্রভাব পড়ে। এতে ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। শিল্পের বর্তমান সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে গিয়ে বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশে অফশোর অনুসন্ধানে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হবে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে শিল্পে এলপিজি ব্যবহারের প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রস্তাবটি কার্যকর ও শিল্পবান্ধব হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমাদের সরকার প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেন্ডলি। দেশের ক্রাইসিস মোমেন্টে অনেকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে। তাদের বলতে চাই, দেশের ক্রাইসিস বাড়িয়ে দিয়ে আপনারা কিছু হাসিল করতে পারবেন না।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ সংকটের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সংকটে থাকা মানুষের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট হলেও পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ প্রতিবছর দেশীয় কূপগুলোর উৎপাদন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট করে কমছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, চাইলেই রাতারাতি এলএনজি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। নতুন এফএসআরইউ কার্যকর করতে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগতে পারে। তবে সরকার দুই বছরের কম সময়ে এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তৃতীয় ও চতুর্থ এফএসআরইউ এবং মাতারবাড়ীতে ল্যান্ডবেসড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলপিজির দাম নিয়ে তিনি বলেন, বাজার স্থিতিশীল করতে সরকার বাল্ক এলপিজি আমদানি করে বিদ্যমান অবকাঠামো ও জনবল কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী সাড়ে চার বছরে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ রুফটপ সোলার এবং বাকি অংশ ল্যান্ডবেজড প্রকল্প থেকে আসতে পারে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, অতীতে যেসব ভুলের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, সেগুলো এখন বাস্তব সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় এফএসআরইউ ও এলএনজি আমদানি প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাধান নয়। কারণ জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ডলার সংকটও রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে জ্বালানি সংকট সমাধান কঠিন হবে। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমেই কমছে। দ্রুত অনুসন্ধান বাড়িয়ে উৎপাদন অন্তত ২ হাজার এমএমসিএফডির কাছাকাছি ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজ বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কমাতে হবে। ২০৩০ সালে দেশে গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্যানেল আলোচনায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ভিসি অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকটের কোনো একক তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং দ্রুত ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, বাপেক্স-নির্ভর গ্যাস অনুসন্ধান নীতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে কাজে লাগাতে হবে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনাময় স্তরগুলো উন্নত প্রযুক্তিতে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ছাতক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ক্যাব’র জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। এ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ না করা। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা না বাড়িয়ে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস ও বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেঞ্চমার্ক মূল্য ও বিনিয়োগের শর্ত স্পষ্ট করা জরুরি।

ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, জ্বালানি চাহিদা পূরণে কোনো একটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তেল-গ্যাস ও এলএনজিসহ সব উৎসকে কাজে লাগাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, জরুরি চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মাতারবাড়ীতে বড় ল্যান্ডবেসড এলএনজি টার্মিনাল গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে মাতারবাড়ীকে আঞ্চলিক এনার্জি হাব হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। নীতিগত অনিশ্চয়তা ও একতরফা সিদ্ধান্ত বেসরকারি খাতকে নিরুৎসাহিত করে। জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রেখে অর্থনীতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। সব উৎসের সমন্বয়ে প্রতিযোগিতামূলক গড় জ্বালানি ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার এসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এ সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে তৃতীয় এফএসআরইউ বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে ল্যান্ডবেসড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ জরুরি। শিল্প ও বিনিয়োগের স্বার্থে দেশের কয়লার মজুদও কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এফইআরবি’র চেয়ারম্যান এম আজিজুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন এফইআরবির নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ। সঞ্চালনা করেন ইকবাল আহসান ও শাকিলা জেরিন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

আগারগাঁওয়ে ভাইরাল মিজানের হোটেল আবারও উচ্ছেদ, সরানো হলো রান্নার সরঞ্জাম

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ‘ভাইরাল মিজান’-এর ১০০ টাকার গরুর মাংস-ভাতের হোটেল আবারও উচ্ছেদ করেছে ডিএনসিসি। মঙ্গলবার দুপুরে…

9 minutes ago

রাজশাহীতে হত্যা মামলায় পান দোকানিকে ফাঁসানোর অভিযোগ, পরিবারের সংবাদ সম্মেলন

রাজশাহীর ডিঙ্গাডোবায় মুদিদোকানি বারিউল ইসলাম হত্যা মামলায় পান দোকানি হানিফ আলী ও তার ভাইকে ফাঁসানোর…

7 hours ago

উয়েফার বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার ও হয়রানির’ অভিযোগ আনল ফিফা

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ও ইউরোপিয়ান ফুটবল ফেডারেশন উয়েফার মধ্যকার দ্বন্দ্ব গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত।…

8 hours ago

ক্যালিফোর্নিয়ার সরকারি ছুটির তালিকায় যুক্ত হলো দুই ঈদ

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সরকারি ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। গভর্নর গ্যাভিন…

8 hours ago

মনপুরায় ১০০ ইয়াবাসহ দুই যুবক আটক

ভোলার মনপুরা উপজেলায় ১০০ ইয়াবা উদ্ধারসহ দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার ভোরে রামনেওয়াজ লঞ্চঘাট…

8 hours ago

রণবীরের জন্মদিনে আলিয়ার বিশেষ পোস্ট, নেটদুনিয়ায় মুগ্ধতা

বলিউড তারকা রণবীর কাপুরের জন্মদিনে আলিয়া ভাট শেয়ার করলেন তাদের একান্ত ভালোবাসার মুহূর্তের ছবি, যা…

8 hours ago

This website uses cookies.