Header Premium (728×90)

খুলনায় ২৫৫৮ কোটির পানি সরবরাহ প্রকল্পে বিপর্যয়, মিলছে না প্রত্যাশার অর্ধেকও

খুলনা মহানগরীর সুপেয় পানির দীর্ঘদিনের সংকট দূর করার লক্ষ্যে ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-১)। তবে চালুর পর থেকেই এই মেগা প্রকল্পটিকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পরিশোধনের পরও পানিতে লবণ থাকা, শুষ্ক মৌসুমে চাহিদামতো পানি না পাওয়া এবং বছরের অধিকাংশ সময় সরবরাহ বন্ধ থাকার মতো পুরোনো অভিযোগ তো রয়েছেই, তার ওপর এখন বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটিও ধরা পড়েছে। একাধিক পাম্প মেশিন বিকল হয়ে থাকায় বর্তমানে প্রত্যাশার অর্ধেক পানিও মিলছে না। সেই সঙ্গে জোড়াতালির পাইপলাইন নগরবাসীর সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পটিতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্রই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

খুলনা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০১১ সালে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। বাগেরহাটের মোল্লাহাট এলাকার মধুমতি নদী থেকে পানি এনে তা শোধনের পর নগরবাসীকে সরবরাহ করার কথা ছিল। প্রকল্পের মূল কাজের মধ্যে ছিল মধুমতি নদীর তীরে ইনটেক ফ্যাসিলিটি স্থাপন, রূপসার সামন্তসেনায় ১১ কোটি (১১০ এমএলডি) লিটার ধারণক্ষমতার বিশাল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও ইম্পাউন্ডিং জলাধার নির্মাণ, মধুমতি নদী থেকে শোধনাগার পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটারের বেশি কাঁচা পানি সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন, নতুন পাইপলাইন নেটওয়ার্ক এবং নগরীতে ওভারহেড ট্যাংক বা জলাধার নির্মাণ। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। চালুর সময় দাবি করা হয়েছিল, সামন্তসেনা শোধনাগার থেকে প্রতিদিন ১১ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের মাধ্যমে নগরীর সংকট দূর হবে। কিন্তু লক্ষ্য পূরণ তো দূরের কথা, উল্টো বিপুল পরিমাণ পানি অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সমিশন পাইপলাইনটি কাটাখালী খালের অংশে ভেসে উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী পাইপটি ৫০ ফুট গভীরে বসানোর কথা থাকলেও তা বসানো হয়েছে মাত্র ২০ ফুট গভীরতায়। এছাড়া কাটাখালী খালের পাম্প স্টেশনের চারটি পাম্প মেশিনের একটি প্রকল্প শুরুর পর থেকেই নষ্ট। ফলে একটিকে বিশ্রামে রেখে বাকি দুটি পাম্প দিয়ে পানি তুলতে হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। অন্যদিকে, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের ছয়টি সাবমার্সিবেল পাম্পের মধ্যে তিনটিই বিকল। মাত্র তিনটি পাম্প চালু থাকায় প্ল্যান্টের উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে।

পানির এই তীব্র সংকট নিয়ে লবণচরা এলাকার বাসিন্দা মনোর হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ওয়াসার পানি পাই না। গ্রীষ্ম, শীত বা বসন্ত—কোনো ঋতুতেই পানি আসে না। বাধ্য হয়ে আমাদের টিউবওয়েলের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে ওয়াসার বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল হোসেন জানান, দক্ষ জনবল দিয়ে সঠিকভাবে দেখভাল না করার কারণেই মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

প্রকল্পটির আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো বিশাল অঙ্কের সিস্টেম লস। ওয়াসা সূত্রের তথ্যমতে, বর্তমানে সামন্তসেনা শোধনাগার থেকে দৈনিক প্রায় ৬ কোটি লিটার পানি উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর আগেই এর প্রায় ২০ শতাংশ বা ১ কোটি ২০ লাখ লিটার পানি হারিয়ে যাচ্ছে, যার বিপরীতে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না ওয়াসা। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত নগর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নন-রেভিনিউ ওয়াটারের হার এক অঙ্কে (ওয়ান ডিজিট) রাখার চেষ্টা করা হয়, সেখানে খুলনায় ২০ শতাংশ ক্ষতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে পানির ঘাটতির কথা স্বীকার করলেও প্রকৌশলী আরমান হোসেন দাবি করেন, বর্তমানে ৪৪-৪৫ হাজার গ্রাহককে পানি দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহক বাড়লে পানি বিক্রির পরিমাণ ও আয় দুই-ই বাড়বে। এছাড়া এই সিস্টেম লস আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়েও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী দাতা সংস্থা জাইকা ও এডিবির ঋণ ৩০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করার কথা। প্রতিবছর ৩০ কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রকল্প থেকে এখন পর্যন্ত একটি টাকাও ঋণ শোধ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে এই প্রকল্প থেকে ওয়াসার বার্ষিক আয় মাত্র ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যার সিংহভাগই চলে যায় বিদ্যুৎ বিল ও প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে।

এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, এই প্রকল্পটিকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলা যায়। তৎকালীন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক (পিডি), প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা মিলে লুটপাট করে মেগা প্রকল্পটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। তবে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুলনা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ আশ্বস্ত করে বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor

Recent Posts

দুর্বল ৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রোববার প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের

দুর্বল পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রোববার প্রশাসক নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রক্রিয়ার অংশ…

28 minutes ago

নিত্যপণ্যের চড়া দামে দিশেহারা নিম্নবিত্ত, সংসার চালানোই বড় চ্যালেঞ্জ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। এতে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে পণ্য কমাতে বাধ্য হচ্ছেন…

41 minutes ago

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমল, ভরিতে কমলো ৩২৬৬ টাকা

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। প্রতি ভরিতে ৩ হাজার…

42 minutes ago

গফরগাঁওয়ে জামালপুর কমিউটার ট্রেনের চারটি বগি লাইনচ্যুত

ময়মনসিংহের গফরগাঁও রেলস্টেশনে ঢোকার মুখে জামালপুর কমিউটার ট্রেনের চারটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। শুক্রবার সকালের এ…

54 minutes ago

ইরান যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে, আশা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড…

1 hour ago

পশ্চিমবঙ্গে লাউডস্পিকার অপসারণ নিয়ে বিতর্ক, পুলিশের বিরুদ্ধে চাপের অভিযোগ

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মসজিদে পুলিশ মৌখিকভাবে লাউডস্পিকার অপসারণের চাপ দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে রাজ্যজুড়ে…

2 hours ago

This website uses cookies.