Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

সিরিয়া-লেবাননে ধাক্কা খেলেও জলপথে বাড়ছে ইরানের প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ইরানের ভূরাজনৈতিক প্রভাবের ভূগোলকে নতুন করে বদলে দিচ্ছে। সিরিয়া ও লেবাননের মতো ঐতিহ্যগত স্থলভাগে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোয় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে তেহরান। এক অঞ্চলের প্রভাব হারিয়ে অন্য অঞ্চলে নতুন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করছে ইরান ও তার মিত্ররা।

গত সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখে ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরে লেবাননের দক্ষিণে আল তাহির পাহাড়ের নিচের একটি শক্তিশালী হিজবুল্লাহ ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয় ইসরায়েল। গত দুই বছরে ইরানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিজবুল্লাহ তাদের অস্ত্রের বড় অংশ এবং অনেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে হারিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাবকে অনেকটাই সংকুচিত করেছে। আসাদ সরকারের পতনের ফলে হিজবুল্লাহর কাছে ইরানের রসদ ও অস্ত্র সরবরাহের মূল পথটি বন্ধ হয়ে গেছে।

কৌশলগত এই দুর্বলতার বিপরীতে ইয়েমেনে ইরানের আরেকটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা এবং মোখা বন্দর ও পেরিম দ্বীপ দখল করে বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে এগিয়ে গেছে। এই প্রণালিটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে অবস্থান শক্ত করায় সমুদ্রের জাহাজ চলাচলের ওপর নজর রাখতে পারছে। যদিও হুতিরা কেবল নির্দিষ্ট কিছু জাহাজে হামলার দাবি করছে, তবে তাদের এই হুমকির কারণে বিশ্বজুড়ে নৌপরিবহন খরচ ও বিমা ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।

২০২৬ সালে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এহিয়া রহিম সাফাবি এক সম্মেলনে বলেছিলেন, সিরিয়া ও লেবাননের মাধ্যমে ইরানের প্রভাব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তখন হিজবুল্লাহর অস্ত্র ও সিরিয়ার রসদ সরবরাহ পথ ছিল ইরানের কৌশলগত সুরক্ষার মূল ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার পর ইরান এখন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। গত ৮ জুন কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি একটি নতুন নিরাপত্তাবলয়ের ঘোষণা দেন, যা হরমুজ প্রণালি থেকে বাব আল-মানদেব এবং পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে, সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে ইরান ও তার মিত্ররা নতুন কৌশল নিয়েছে।

হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তাদের কেবল ইরানের নির্দেশনায় চলা দল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইয়েমেনের ভেতরে নিজেদের শাসন সুসংহত করা এবং সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপ কমানো তাদের প্রধান লক্ষ্য। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ইরান থেকে সামরিক উপদেষ্টা ও ড্রোন প্রযুক্তি পাঠিয়ে হুতিদের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। হুতিরা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের লড়াই তাদের যৌথ স্বার্থ রক্ষা করে।

ইরান ও হুতিদের এই কৌশলের কারণে সৌদি আরব বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। লোহিত সাগরের বন্দরগুলো নিরাপদ না থাকায় সৌদি আরব তাদের জ্বালানি রপ্তানি আবার হরমুজ প্রণালির দিকে ঘোরাতে বাধ্য হচ্ছে, তবে সেখানেও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা নেই। এমনকি সৌদি আরবের স্থলভাগের পাইপলাইনগুলোও এখন ঝুঁকিমুক্ত নয়। সম্প্রতি ইরাক থেকে চালানো একটি ড্রোন হামলায় সৌদি পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের তিনটি পাম্পস্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরাকে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই হামলা চালাচ্ছে, যা ইরাক সরকার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন হুমকি তৈরি করার সুযোগ করে দিয়েছে। ইরানি নেতৃত্ব মনে করছে, এই দীর্ঘায়িত সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াবে এবং যেকোনো আলোচনায় তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইরানের নিজস্ব অর্থনীতির ক্ষতি কাটাতে সাহায্য করবে না। উপরন্তু, সৌদি আরবও তাদের বাণিজ্যিক নিরাপত্তার জন্য ইরানের ওপর নির্ভরশীল হতে চাইবে না, বরং তারা আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

কৃষি ও কৃষককে গুরুত্ব দিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান কৃষিমন্ত্রীর

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে কৃষক ও কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মৎস্য ও…

3 minutes ago

ধানমন্ডিতে তরুণীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে যুবককে মারধর, পরে কারাদণ্ড

ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডে এক তরুণীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ রানাকে এক মাসের কারাদণ্ড…

29 minutes ago

চিংড়ি রপ্তানি বাড়াতে ৬০০ চাষিকে নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির চাহিদা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে ৬০০ চিংড়িচাষিকে নিয়ে বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।…

31 minutes ago

তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী নেদারল্যান্ডস

তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং কারিগরি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডস সরকারের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ।…

35 minutes ago

সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির নতুন নীতিমালা জারি

সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা প্রকাশ করেছে…

1 hour ago

পলাশবাড়ীতে প্লাবন হত্যা মামলার আসামি শ্রমিক লীগ নেতা লিটন গ্রেপ্তার

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আলোচিত শিবিরকর্মী রেজবুল হক সরকার প্লাবন হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ও শ্রমিক লীগ…

2 hours ago

This website uses cookies.