Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক আধিপত্য বিস্তারের নতুন ছক

লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ও প্রভাব নতুন করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘আমেরিকাস কাউন্টার-কার্টেল কোয়ালিশন’ (এসিসিসি) এবং মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের (সাউথকম) নতুন টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে তার সামরিকীকরণ নীতি জোরদার করছে। বামপন্থী রাজনীতির প্রভাব হ্রাসের সুযোগে মার্কিন প্রশাসন লাতিন দেশগুলোর সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে, যা মূলত ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক ‘মনরো নীতি’র এক আধুনিক সংস্করণ বা ‘ট্রাম্প করোলারি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তবে এই সামরিক শক্তির বিস্তার অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চলতি বছরের মার্চ মাসে গঠিত এসিসিসি জোটে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ১৭টি দেশ যুক্ত রয়েছে। এই দেশগুলো হলো—আর্জেন্টিনা, বাহামা, বেলিজ, বলিভিয়া, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, গায়ানা, গুয়াতেমালা, প্যারাগুয়ে, জ্যামাইকা, পানামা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো,হন্ডুরাস, এল সালভাদর, ডমিনিকান রিপাবলিক, কলম্বিয়া ও পেরু। ভেনেজুয়েলা আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটের অংশ না হলেও দেশটি মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য নিজের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড উন্মুক্ত করে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে পুরো ‘আন্দিয়ান আর্ক’ অঞ্চলটি এই জোটের আওতাভুক্ত হয়েছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সরবরাহ করা কোকেনের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সংগঠিত অপরাধী চক্রের মূল ঘাঁটি।

বিশ্লেষকদের মতে, এসিসিসি কেবল মাদক চোরাচালান dমনের জন্য তৈরি হয়নি। ট্রাম্প নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, এই জোটের অন্যতম লক্ষ্য হলো ‘পশ্চিম গোলার্ধের বাইরে থেকে আসা ক্ষতিকর প্রভাব’ মোকাবিলা করা, যা মূলত চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করে। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি স্থল অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টার মাত্র দুই মাস পর ফ্লোরিডায় এসিসিসি গঠিত হওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এর ধারাবাহিকতায় গত ৪ আগস্ট মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড ‘ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফিয়ার জয়েন্ট টাস্কফোর্স’ গঠনের ঘোষণা দেয়। এই নতুন টাস্কফোর্সের কাজ হলো মিত্র দেশগুলোর সামরিক অভিযানের সমন্বয় সাধন এবং এসিসিসির ১৮টি সদস্যরাষ্ট্রের কমান্ড ও কন্ট্রোলকে একত্রিত করা।

সাম্প্রতিক সময়ে এই জোটের অধীনে বেশ কিছু সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। গত জুনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে জানান, ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্কিন সামরিক বাহিনী বলিভার রাজ্যে ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’ নামের একটি অপরাধী চক্রের নেতা হেক্টর গেরেরো ফ্লোরেসকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়, যা পরে ভেনেজুয়েলা সরকারও যৌথ অভিযান হিসেবে স্বীকার করে। এছাড়া আগস্টের শেষ ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে নতুন টাস্কফোর্স সন্দেহভাজন কিছু জলযানে হামলা চালায়, যাতে অন্তত দুজন নিহত হয়। এটি ছিল মূলত ‘সাউদার্ন স্পিয়ার’ অভিযানের অংশ, যে অভিযানে এ পর্যন্ত অন্তত ২২০ জন নিহত হয়েছে। তবে নিহতরা আসলেই মাদক পাচারকারী ছিল কি না, তা নিয়ে কোনো তদন্ত হয়নি। এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, কলম্বিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অ্যাবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লা মাদক-সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে সে দেশে মার্কিন বাহিনীকে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছেন।

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস বেশ রক্তাক্ত। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে কিউবায় ‘বে অব পিগস’ আক্রমণ বা গ্রেনাডায় আগ্রাসনের মতো প্রকাশ্য অভিযান চালিয়েছে ওয়াশিংটন। পরবর্তীতে ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চলা ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’র অধীনে মাদক ও বামপন্থী বিদ্রোহীদের দমনের নামে ১০ বিলিয়ন ডলার মার্কিন তহবিল দেওয়া হয়েছিল। তবে এই পরিকল্পনা কলম্বিয়াকে আরও বেশি সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দেয় এবং সশস্ত্র সংঘাত ও কার্টেল সহিংসতা বাড়িয়ে তোলে। সে সময় মার্কিন প্রশিক্ষিত কলম্বিয়ার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদের সাফল্য দেখাতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করে বিদ্রোহী হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল।

অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রভাব কেবল নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসিসিসির সদস্য হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো প্রথাগত জাতীয় প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ দিতে হচ্ছে, যা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াবে। এছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিচার থেকে রেহাই দিতে এসিসিসি সদস্যদেশগুলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চাপ দিচ্ছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এই জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাব লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে উদীয়মান কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান ব্যাহত করবে বলে মনে করছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও হাইড্রোকার্বন বিশেষজ্ঞ কার্লোস এইচ ব্র্যান্ড এস।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

৯ লাখ টাকায় আপসের দাবি: গাড়িচাপায় নিহত শ্রমিকের ন্যায়বিচার কি অধরা?

বারিধারায় ফুটপাতে নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায়…

35 minutes ago

বিমান বাহিনীর ১৩২তম জেসিএসসি কোর্সের সনদপত্র বিতরণ করলেন বিমান বাহিনী প্রধান

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজারে ১৩২তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের (জেসিএসসি) সমাপনী ও সনদপত্র…

37 minutes ago

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মোকাবিলায় জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ৪ প্রস্তাব

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘে চারটি প্রস্তাব দিয়েছেন…

47 minutes ago

হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ঘোষণা ইরানের

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির পূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখবে ইরান বলে জানিয়েছেন ইরানের…

1 hour ago

রাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অ্যালামনাই সম্মিলনের থিম সং গাইলেন আরিফ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় অ্যালামনাই সম্মিলন ২০২৬-এর থিম সং ‘প্রিয় মতিহার’-এ কণ্ঠ দিয়েছেন সংগীতশিল্পী…

1 hour ago

হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে জাতিসংঘে ৮০ দেশের যৌথ আহ্বান

হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছে ৮০টি দেশ। একই সঙ্গে…

2 hours ago

This website uses cookies.