Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

নেপালের দুর্যোগ থেকে শিক্ষা: বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও করণীয়

২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্প এবং ২০২৬ সালের নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী ভয়াবহ ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষপ্রবাহ ও আকস্মিক বন্যা—দুটি ভিন্ন প্রকৃতির দুর্যোগ হলেও এগুলোর মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। তা হলো—অন্যের সহায়তা গ্রহণের আগে একটি রাষ্ট্রকে নিজের সক্ষমতা, প্রয়োজন এবং সীমাবদ্ধতা জানতে হয়। ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। কয়েক সেকেন্ডের প্রবল কম্পনে শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা, বসতবাড়ি, বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও সরকারি অবকাঠামো ধসে পড়ে। প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। সেদিন নেপাল শুধু ভূমিকম্পের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেনি; তাকে একই সঙ্গে উদ্ধার, চিকিৎসা, ত্রাণ, তথ্য, আন্তর্জাতিক সহায়তা ও দুর্যোগ-কূটনীতির একটি জটিল যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছিল।

ভূমিকম্পের পর বিশ্বজুড়ে বিরাট মানবিক সাড়া সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের সমন্বয় ব্যবস্থায় ৩১টি দেশের ৭৬টি আন্তর্জাতিক আরবান সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (উসার) দল নেপালে নিবন্ধিত হয়। এসব দলে ছিলেন প্রায় ১ হাজার ৮৭২ জন উদ্ধারকর্মী এবং ১১৮টি অনুসন্ধানী কুকুর। অনুসন্ধান, উদ্ধার, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তাকারী দল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক উপস্থিতি শতাধিক দলে পৌঁছে যায়। মানবিক সংহতির দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে অনন্য। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা আবেগের চেয়ে অনেক কঠিন। বিপুলসংখ্যক দল কোনো দেশে পৌঁছানো মানেই যে বিপুলসংখ্যক জীবন রক্ষা পাবে, এমন সরল সমীকরণ বাস্তবে কাজ করে না। একটি উদ্ধারকারী দল কতজন সদস্য নিয়ে এসেছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দলটি কী করতে পারে, কত দ্রুত কাজ শুরু করতে পারে, কী ধরনের সরঞ্জাম এনেছে এবং কতক্ষণ স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে মাঠে থাকতে পারে।

নেপালে আসা দলগুলোর সক্ষমতাও সমান ছিল না। কিছু দল নিজ দেশের নিখোঁজ নাগরিক, পর্যটক ও পর্বতারোহীদের সন্ধানে স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার দিয়েছিল। কিন্তু ভারী রিইনফোর্সড কংক্রিট ভেঙে গভীর ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ উদ্ধারের জন্য যে হেভি উসার এবং ডিপ-কলাপস রেসকিউ সক্ষমতা প্রয়োজন, তা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। একটি বহুতল কংক্রিট ভবন ধসে পড়লে শুধু হাতুড়ি, শাবল কিংবা জনবল দিয়ে কার্যকর উদ্ধার পরিচালনা করা যায় না। প্রয়োজন হয় কংক্রিট কাটা, দেয়াল ও মেঝে ছিদ্র করা, ভারী ধ্বংসাবশেষ উত্তোলন, অস্থিতিশীল কাঠামোকে শোরিংয়ের মাধ্যমে সাময়িকভাবে নিরাপদ রাখা, টানেল তৈরি, সংকীর্ণ স্থানে প্রবেশ এবং শব্দ, ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করে জীবিত মানুষের অবস্থান শনাক্ত করার দক্ষতা। পাশাপাশি প্রয়োজন হয় কাঠামোগত প্রকৌশলী, উদ্ধারস্থলে চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রশিক্ষিত জনবল এবং একটি নির্ভরযোগ্য কমান্ড ব্যবস্থা।

নেপালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেল, কখনো একই কর্মস্থলে একাধিক দল উপস্থিত হয়েছে, আবার কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় দল পৌঁছাতে পারেনি। অসম্পূর্ণ তথ্য, ভাষাগত সমস্যা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বিমানবন্দরে অতিরিক্ত চাপ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়গত সীমাবদ্ধতা বহু দলের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। কোনো কোনো দলকে কাজ দেওয়ার আগেই তাদের অবস্থান, সক্ষমতা ও প্রয়োজন বোঝার জন্য মূল্যবান সময় ব্যয় করতে হয়েছে। দুর্যোগস্থলে দলের সংখ্যা জীবন বাঁচায় না; সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে, সঠিক দক্ষতা ও সরঞ্জামসম্পন্ন দলকে নিয়োগ করাই জীবন বাঁচায়।

ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে সাধারণত জীবিত মানুষ উদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বলা হয়। তবে বিদেশি দলকে নিজ দেশ থেকে প্রস্তুত হয়ে বিমানযোগে আসতে হয়। ফলে সবচেয়ে মূল্যবান প্রাথমিক সময়টিতে উদ্ধার করেন স্থানীয় মানুষ—প্রতিবেশী, স্বেচ্ছাসেবক, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসাকর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসন। অর্থাৎ বড় দুর্যোগে প্রথম উদ্ধারকারী কোনো বিদেশি বিশেষজ্ঞ নন; প্রথম উদ্ধারকারী প্রায় সব সময়ই একজন প্রতিবেশী। জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে গেলে শুরু হয় আরও কঠিন, বেদনাদায়ক এবং মানসিকভাবে চাপপূর্ণ একটি পর্যায়। মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্তকরণ মানবিক মর্যাদা, ধর্মীয় অধিকার, আইনগত প্রমাণ, বিমা, উত্তরাধিকার এবং স্বজনদের মানসিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জড়িত। তাই বড় দুর্যোগে প্রথম দিন থেকেই পৃথক মরদেহ ব্যবস্থাপনা দল, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, নম্বরযুক্ত বডি ব্যাগ, আলোকচিত্র ও অবস্থান নথিবদ্ধকরণ, অস্থায়ী মর্গ, রেফ্রিজারেটেড সংরক্ষণ এবং একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার প্রস্তুত রাখা জরুরি।

২০২৬ সালের নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী বিপর্যয়ে ২০১৫ সালের সেই তিক্ত শিক্ষার প্রতিফলন আরও স্পষ্ট। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ অনুসন্ধান ও উদ্ধার সহায়তার প্রস্তাব দিলেও নেপাল তাৎক্ষণিকভাবে বিদেশি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দল গ্রহণে আগ্রহ দেখায়নি। নেপাল সরকারের বক্তব্য ছিল, তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পরিচালনায় সক্ষম। এটি কি আত্মনির্ভরতা, নাকি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস? নিজস্ব বাহিনীর সক্ষমতা থাকলে বিদেশি দল না নেওয়া একটি বৈধ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। কিন্তু শুধু জাতীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা-সন্দেহ কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সহায়তা প্রত্যাখ্যান করলে সেটি আত্মনির্ভরতা নয়—ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা। সহায়তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত আবেগ, অহংকার কিংবা কূটনৈতিক চাপের ভিত্তিতে নয়; পেশাগত মাল্টিসেক্টর র‍্যাপিড নিডস অ্যাসেসমেন্ট-এর ভিত্তিতে নিতে হবে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটে বড় ভূমিকম্প হলে একই সঙ্গে হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সরু ও বাধাগ্রস্ত সড়ক, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ভবন, খোলা জায়গার অভাব, গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড, হাসপাতালের ক্ষতি এবং যোগাযোগ–বিচ্ছিন্নতা উদ্ধার অভিযানকে ভয়াবহভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। অতএব, বিদেশি উদ্ধারকারী দলের ওপর নির্ভরতাকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিকল্পনার প্রধান ভিত্তি বানানোর সুযোগ নেই। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের হেভি উসার দল গঠন করতে হবে। তাদের কাটিং, ব্রেকিং, ব্রিচিং, শোরিং, লিফটিং, টানেলিং এবং কনফাইন্ড স্পেস রেসকিউ সক্ষমতা থাকতে হবে। প্রতিটি দলকে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও আবাসনসহ অন্তত ৭২ ঘণ্টা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করার উপযোগী করতে হবে। একটি স্থায়ী ন্যাশনাল উসার কো-অর্ডিনেশন সেল, জাতীয় ডিভিআই ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় অপারেশনাল তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি লাইট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দল গঠন করা। দুর্যোগের ধ্বংসস্তূপ নির্মম আয়নার মতো। সেখানে রাষ্ট্রের বক্তৃতা নয়, প্রস্তুতির প্রকৃত চেহারা প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগ-প্রস্তুতির মূলনীতি তাই এখনই নির্ধারিত হওয়া উচিত—নিজস্ব সক্ষমতাই হবে প্রথম প্রতিরক্ষা; বিদেশি সহায়তা হবে প্রয়োজনভিত্তিক।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

লোক দেখানো ইবাদত থেকে বাঁচার উপায় ও করণীয়

ইসলামে ইবাদতের একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত থেকে বাঁচতে নিয়তের…

6 minutes ago

জমি ছাড়ার নোটিশে দিশেহারা নাটোরের দিনমজুরের কলেজপড়ুয়া তিন মেয়ে

নাটোরের গুরুদাসপুরে অন্যের জমিতে ১২ বছর ধরে বসবাস করা এক দিনমজুরের পরিবারকে তিন মাসের মধ্যে…

9 minutes ago

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হলেন নোমান মাহমুদ

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে পাকিস্তানের সাবেক…

26 minutes ago

হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন দেবাশীষ রায় চৌধুরী

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী। বৃহস্পতিবার…

35 minutes ago

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাত্র কল্যাণ পরিষদের নবীনবরণ ও বিদায়

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্র কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে নবীনবরণ ও প্রবীণ বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।…

38 minutes ago

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং দমনে একরাতে ৬২৪ জন আটক

কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬২৪ জনকে আটক…

47 minutes ago

This website uses cookies.