Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

গবেষণায় সততা: বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিহার্য দায়বদ্ধতা

একটি মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় তার প্রকাশিত গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা ও গুণগত মানের ওপর, কেবল গবেষণার সংখ্যার ওপর নয়। যদিও গবেষণার সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সেই গবেষণাগুলো সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছে কি না। প্রতিটি নতুন গবেষণা আগের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তাই একটি ত্রুটিপূর্ণ বা অসৎ গবেষণাপত্র কেবল একজন গবেষকের ব্যর্থতা নয়, বরং তা নীরবে গোটা জ্ঞানের ভিতকেই দুর্বল করে দেয়। গবেষণায় সততা তাই কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি গবেষণার একটি মৌলিক চাহিদা এবং গবেষকের চরিত্রের পরিচায়ক।

সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একের পর এক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহারের ঘটনা জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, তথ্যের অসংগতি, চৌর্যবৃত্তি কিংবা অর্থের বিনিময়ে গবেষণাপত্র তৈরির অভিযোগগুলো কেবল সংশ্লিষ্ট গবেষকের নয়, বরং গোটা দেশের গবেষণা-অঙ্গনের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রশ্নটি কেবল নৈতিকতার নয়, এটি প্রতিযোগিতারও। বিশ্বজুড়ে একজন গবেষকের মান যাচাই হয় তাঁর কাজ কতবার উদ্ধৃত হয়েছে তার ভিত্তিতে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ের একটি বড় অংশ নির্ভর করে গবেষণা ও সাইটেশনের সংখ্যার ওপর। একটি প্রত্যাহৃত গবেষণাপত্র সেই উদ্ধৃতি মুছে দেয়, গবেষকের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করে। চৌর্যবৃত্তি বা অনিয়মে ভরা প্রকাশনা তাই দীর্ঘমেয়াদে র‍্যাঙ্কিং বাড়ায় না, উল্টো তা কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। অর্থাৎ গবেষণায় সততা ও বৈশ্বিক অবস্থান একই সুতায় গাঁথা।

গবেষণায় অনিয়ম রোধের প্রকৃত উপায় শুধু শাস্তি নয়, বরং এমন একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে অনিয়মের সুযোগই সীমিত হয়ে আসে। গবেষণায় সততা রক্ষা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি গোটা উচ্চশিক্ষা খাতের যৌথ দায়। বাংলাদেশের গবেষকদের মেধা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই, প্রয়োজন কেবল এমন একটি পরিবেশ যেখানে সততা সুবিধার বিষয় নয়, বরং স্বাভাবিক অভ্যাস। সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গবেষণা কেবল সংখ্যায় নয়, মর্যাদা ও র‍্যাঙ্কিংয়েও এগিয়ে যাবে।

এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি করণীয় বিবেচনা করা উচিত। প্রথমত, প্রয়োজন সচেতনতা। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত নিয়মিতভাবে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গবেষণা-নৈতিকতাবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা, যেন প্রকাশনার নৈতিকতা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে গবেষণা-সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন কাঠামোবদ্ধ যাচাই-ব্যবস্থা। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রকাশনায় আর্থিক সহায়তা দেয়, কিন্তু এই সহায়তা যেন স্বয়ংক্রিয় না হয়। প্রতিটি আবেদন বিভাগীয় প্রধান ও সংশ্লিষ্ট ডিনের প্রাথমিক যাচাইয়ের পর স্কুল বা অনুষদ পর্যায়ের গবেষণা কমিটির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা খতিয়ে দেখা উচিত। ধাপে ধাপে একাধিক চোখ একই গবেষণার ওপর পড়লে ত্রুটি লুকিয়ে থাকার সুযোগ কমে আসে।

তৃতীয়ত, প্রয়োজন চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধে দৃঢ় নীতিমালা। প্রতিটি গবেষণাপত্র জমা বা প্রকাশের আগে বাধ্যতামূলকভাবে সাদৃশ্য যাচাই ও চৌর্যবৃত্তি পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। একটি প্রতিষ্ঠান যখন স্পষ্ট করে দেয় যে চৌর্যবৃত্তি কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং সেই অবস্থান কার্যকরভাবে মেনে চলে, তখন গবেষকদের মধ্যে সততার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। জাতীয় পর্যায়েও কিছু বিষয় জরুরি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রয়োগযোগ্য প্রকাশনা-নৈতিকতা নীতিমালা থাকা দরকার, যা বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানেই অনুপস্থিত। এছাড়া প্রণোদনা যেন সংখ্যাভিত্তিক না হয়ে মানভিত্তিক হয়, কারণ ‘কত বেশি প্রকাশনা’ যখন ‘কত ভালো প্রকাশনাকে’ ছাপিয়ে যায়, তখনই অনিয়মের প্রলোভন তৈরি হয়। সবশেষে, কমিটি অন পাবলিকেশন এথিকসের (কোপ) মতো আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে সংগতি রেখে নিজেদের প্রক্রিয়া গড়ে তোলা উচিত।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

পৌর কর্মচারীদের সব সমস্যা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস মন্ত্রীর

বাংলাদেশ পৌর কর্মচারী ফেডারেশনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী…

6 minutes ago

দেশের আট বিভাগে মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস

দেশের সবগুলো বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ এবং বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

19 minutes ago

দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিতের নির্দেশ হাইকোর্টের

সড়কসহ যেকোনো দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই…

34 minutes ago

বারিধারায় পাকিস্তান হাইকমিশনারের বাসভবনে আগুন, আইসিইউতে দম্পতি

রাজধানীর বারিধারায় পাকিস্তান হাইকমিশনারের বাসভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হাইকমিশনার ইমরান হায়দার ও তার স্ত্রী নাইমা ইমরান…

35 minutes ago

স্বর্ণ খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈধ শিল্পে রূপান্তরের সরকারি উদ্যোগ

দেশের স্বর্ণ খাতকে অনানুষ্ঠানিক অবস্থা থেকে বের করে বৈধ ও জবাবদিহিমূলক শিল্পে রূপান্তর করতে সরকার…

41 minutes ago

ইয়েমেনে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সরকারি বাহিনীর ৩০ সেনা নিহত

ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় ও পূর্বাঞ্চলে হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সরকারি বাহিনীর অন্তত ৩০ সেনা নিহত ও…

54 minutes ago

This website uses cookies.