Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর বাতিল বিআরটি প্রকল্প, রূপান্তর ৬ লেনের মহাসড়কে

২২ অক্টোবর ২০২৬ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৭ শতাংশ অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই অবকাঠামো প্রকল্পটির নির্মিত অবকাঠামো সরিয়ে এখন পুরো করিডোরটিকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে সড়কের ওপর নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক ভেঙে ফেলা হবে, যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা। এছাড়া সড়কটি প্রয়োজনীয় প্রশস্ত করতে আরও ২৭ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। গত ১৮ অক্টোবর ২০২৬ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ঝুলতে থাকা এই প্রকল্পের অন্যতম বড় ব্যর্থতা ছিল নির্ধারিত বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী শুরুতে স্বয়ংক্রিয় দরজাবিশিষ্ট দীর্ঘ বাস নামানোর কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। পরবর্তী সময়ে বৈদ্যুতিক বাস ক্রয়ের উদ্যোগ কার্যকর হয়নি এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেলচালিত বাস কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও শেষপর্যন্ত বাস আনা সম্ভব হয়নি। এর পাশাপাশি স্টেশনগুলোর নকশায় বাসের দরজার অবস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছিল চরম অসামঞ্জস্য। বিশ্বের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিআরটি লেনের ডান পাশে দরজা রেখে স্টেশন নির্মাণ করা হলেও দেশে চলাচলকারী সাধারণ বাসের দরজা থাকে বাম পাশে। ফলে ডান দিকে দরজাবিশিষ্ট বিশেষ বাস কেনা হলেও সেগুলো নির্ধারিত করিডোরের বাইরে ঢাকা-গাজীপুরের অন্য কোনো পথে চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ত।

প্রকল্পের শেষ মুহূর্তে এসে বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক ও বিশ্লেষণ। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, বিআরটি স্টেশন, র‌্যাম্প ও এস্কেলেটর অপসারণ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত গুনতে হতে পারে। অথচ প্রকল্পে অব্যবহৃত রয়ে যাওয়া ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় বাস কিনে একটি মৌলিক বিআরটি সেবা চালু করা সম্ভব ছিল। তাদের মতে, সাশ্রয়ী বাস কিনলে অতিরিক্ত ২-৩ শত কোটি টাকা এবং আধুনিক ইলেকট্রিক বাস আনলে অতিরিক্ত ১ হাজার কোটি টাকা লাগত। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায় নির্মিত ফ্লাইওভার, র‌্যাম্প ও করিডোর প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও শুধু বাস না কেনার কারণে প্রকল্পটি বাতিল হলো।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটির কারিগরি ও বাস্তব দিক পর্যালোচনা করে। পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ দলটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডোরে বিআরটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনাটি শুরু থেকেই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এবং এটি দেশের অবকাঠামো খাতে 'পদ্ধতিগত ব্যর্থতার' একটি বড় উদাহরণ। বুয়েটের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআরটি চালু রাখতে গেলেও পরবর্তীতে হাজার কোটি টাকা বাড়তি বিনিয়োগ করতে হতো, যা পুরো করিডোরকে স্থবির করে শিল্প-কারখানার মারাত্মক ক্ষতি করত। অধ্যাপক সামছুল হক জানান, বিআরটি বাসে চড়ে গাজীপুরের যাত্রীরা কেবল বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে পারতেন, ঢাকায় ঢোকার জন্য তাদের আবার বাস পরিবর্তন করতে হতো—যা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে এটি বাতিল করাই ছিল সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত বিকল্প।

প্রকল্পটি বাতিলের আগে সরকারের মন্ত্রিসভায় চারটি সম্ভাব্য বিকল্প নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এগুলো হলো—১. প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাতিল করা; ২. অসমাপ্ত কাজ শেষ করে নির্ধারিত বাস কিনে বিআরটি চালু করা; ৩. বর্তমান পথ অপরিবর্তিত রেখে বিশেষ বাসের পাশাপাশি সাধারণ বাস চলতে দেওয়া; এবং ৪. বিআরটি লাইনটি টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা। পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর সরকার প্রথম বিকল্পটি গ্রহণ করে।

প্রকল্পের ইতিহাস অনুযায়ী, ২০১২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিআরটি প্রকল্প গ্রহণ করে। মোট দৈর্ঘ্যের মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সমতল সড়ক ও বাকি অংশ উড়ালপথ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সড়কের মাঝখানের বিশেষ লেনে নির্দিষ্ট বাস চালিয়ে দৈনিক প্রায় ২৫ হাজার যাত্রীর দ্রুত ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা। ২০১৬ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, নকশা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন সরানো, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে বারবার কাজ পিছিয়ে যায়। এর প্রভাবে গাজীপুর-বিমানবন্দর পথের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রস্তাবিত উত্তরা-কেরানীগঞ্জ বিআরটি প্রকল্পটিও বাতিল হয়ে যায়।

প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতায় ব্যয় ও জনগণের ভোগান্তি দুটোই সীমাহীন রূপ নেয়। অনুমোদিত ব্যয় তিন দফায় সংশোধন করে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়, যা মূল অনুমোদিত খরচে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা বা প্রায় ১০৯ শতাংশ বৃদ্ধি। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে পুঞ্জীভূত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা, যা অনুমোদিত বাজেটের প্রায় ৬৬ শতাংশ। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং সময়সীমা ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি। উল্টো দীর্ঘ সময় ধরে চলা নির্মাণকাজের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্রতিনিয়ত চরম যানজট, দুর্ঘটনা ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের শিকার হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।

বর্তমানে বিআরটি করিডোরে যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত পথচারী পারাপার সেতুর চলন্ত সিঁড়ি ও লিফটের বহু যন্ত্রাংশ জং ধরে নষ্ট হচ্ছে কিংবা অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে। লেন পৃথক করতে বসানো সিমেন্টের প্রতিবন্ধক ও লোহার বেড়ায় মূল সড়ক সংকুচিত হয়ে গেছে। এছাড়া কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল রাস্তা আবার কোথাও হঠাৎ সরু লেনের কারণে পুরো পথে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিআরটি নিছক দ্রুত যাতায়াতের মাধ্যম না, এটি দ্রুত বর্ধনশীল, ঘনবসতিপূর্ণ ও কম আয়ের শহরের জন্য গেইম চেঞ্জার। ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের কুরিচিবা শহরে প্রথম বিআরটি চালু হয়। অন্যদিকে, ১৮৬৩ সালে লন্ডনে শুরু হবার পর এখন বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০৫টি শহরে MRT (এমআরটি, মেট্রো রেল, টিউব, স্কাইট্রেন ইত্যাদি নানা নামে) রয়েছে। সংখ্যার বিচারে বিআরটি বৃদ্ধির হার বেশি; ২০০০ সালের পর বিআরটির সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩৮৩%। এর কারণ হলো সাশ্রয়ী ও দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভাব্যতা, বর্তমান রাস্তায় বড় অবকাঠামোগত নির্মাণ না করে কাজ করা এবং ভবিষ্যতে সহজে সম্প্রসারণ করা বা প্রয়োজনে এমআরটি (MRT) বা এলআরটি (LRT) স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ থাকা। বর্তমানে বিশ্বের ১৯১টি শহরে চালু থাকা বিআরটি সিস্টেমে প্রতিদিন ৩ কোটি ২৫ লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ১৩টি শহরে ২২৮ কিলোমিটার বিআরটি লাইনে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ এবং চীনের বিআরটিতে প্রতিদিন ৪৪ লাখ ও তাইওয়ানে ১৩.৫ লাখ যাত্রী পরিবাহিত হন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) তথ্যমতে, মেট্রোরেলের মাত্র এক-দশমাংশ খরচে নির্মিত বিআরটি সেবা ঘণ্টায় ২০-৩৫ কিলোমিটার গতিতে মেট্রোরেলের প্রায় অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করতে পারে। বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণা অনুযায়ী, চট্টগ্রামসহ দেশের বেশ কয়েকটি বড় শহরে বিআরটি সেবা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে দেশের প্রথম বিআরটি প্রকল্প হিসেবে গাজীপুর-ঢাকা রুটে ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও বাস সংগ্রহ ও নকশাগত জটিলতায় তা বন্ধ হয়ে গেল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটি প্রকল্পটি বাতিল করে করিডোরটি অন্য সব বাহনের জন্য উন্মুক্ত করতে গেলেও বিআরটি স্টেশন, র‌্যাম্প এস্কেলেটর অপসারণ করতে হবে ও কন্ট্রাক্টরের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ বাবদ দিতে হবে ১০০০-১২০০০ কোটি টাকা। অথচ এ প্রকল্পের অব্যবহৃত টাকা (১৪০০ কোটি টাকার বেশি) দিয়েই বাস কিনে বেসিক বিআরটি চালু করা সম্ভব।

বিআরটি মানে আমরা সবাই জানি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট। বাংলায় দ্রুতগতির গণপরিবহণ। নগর ও পরিবহণ পরিকল্পনাবিদদের, কাছে বিআরটি এর মানে Better Regeneration of Towns and Territories। নগর পরিকল্পনাবিদরা একে দ্রুত বর্ধনশীল, ঘনবসতিপূর্ণ ও অপেক্ষাকৃত কম আয়ের শহরের জন্য গেইম চেইঞ্জার মনে করেন। এটি নিছক একটি যোগাযোগ অবকাঠামো ও পরিবহণ সেবা নয়। বরং নগর পরিবহণের প্রথাগত অভিজ্ঞতার বিপরীতে কি নতুন সংযোজন করলো, সন্নিহিত নগর কেন্দ্র ও ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী নতুন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন সম্ভাবনা তৈরি করল, আর কত কম খরচে এসব সম্ভাবনা তৈরি করল তার ওপর।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Jugantor

Recent Posts

টেকনাফে রান্নাঘরে মিলল বিশালাকার কিং কোবরা, বন বিভাগের উদ্ধার

কক্সবাজারের টেকনাফে রান্নাঘরে ঢুকে পড়া ২০ ফুট লম্বা একটি কিং কোবরা উদ্ধার করেছে বন বিভাগ।…

20 minutes ago

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নিষিদ্ধ আ.লীগ কার্যক্রমের দায়ে নেতা গ্রেপ্তার

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে রাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ইসমাইল মাহমুদ…

23 minutes ago

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন ফি বৃদ্ধিতে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তনের নিবন্ধন ফি সব পর্যায়ে ২ হাজার টাকা করে বাড়ানোয় ক্ষোভ প্রকাশ…

39 minutes ago

চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত

চীনের তিব্বত অঞ্চলে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। বৃহস্পতিবার রাতে নাগকু অঞ্চলের পার্বত্য…

59 minutes ago

শিউলি ফুলের খোঁজে পরীমণি, মুগ্ধ অনুরাগীরা দিলেন নতুন উপাধি

শরতের স্নিগ্ধ শিউলি ফুলের খোঁজে বের হওয়ার কথা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের কাছ থেকে মিষ্টি…

1 hour ago

১০ দিনে ৭ খুন: টার্গেট কিলিংয়ে দেশজুড়ে বাড়ছে আতঙ্ক

দেশের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১০ দিনে…

1 hour ago

This website uses cookies.