Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারে সার পাচার, কৃত্রিম সংকটে দিশেহারা কৃষক

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (16 September 2026) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে সার পাচার হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সারের তীব্র কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এই কৃত্রিম সংকটকে পুঁজি করে বিসিআইসি ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে সার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা। ভরা মৌসুমে সারের দোকানে দোকানে ঘুরেও সার না পেয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভ নিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন তারা।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস জমিতে সার প্রয়োগের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই ভরা মৌসুমে যদি আমন ধানের জমিতে সময়মতো সার দেওয়া না যায়, তবে ফলন আশানুরূপ হবে না। চলতি আমন মৌসুমে চারা রোপণের পর থেকে টানা বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিশেষ করে আগস্ট মাসজুড়ে অতিবৃষ্টির কারণে আগে দেওয়া সার ধুয়ে চলে গেছে। ফলে এখন সব ধানি জমিতে নতুন করে সার দেওয়ার জরুরি প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকার প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকায় বিক্রির নির্দেশনা দিয়েছে। তবে ডিলাররা এই সরকারি নিয়ম তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো দামে সার বিক্রি করছেন। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বর্তমানে বাজারে প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৬৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৬৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৪৫০ টাকা এবং এমওপি সার ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি দাম রাখা হচ্ছে।

কৃষি অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী ডিলাররা বস্তার মুখ কেটে সার বিক্রি করলেও পাচারকারীদের হাতে সার পৌঁছানো বন্ধ করা যাচ্ছে না। পাচারকারীরা ১০ থেকে ২০ কেজির ছোট ছোট বস্তায় সার সংগ্রহ করে তা পুনরায় সেলাই করে সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে পাচার করে দিচ্ছে। সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্ট গার্ড টেকনাফ এবং উখিয়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে পাচারকালে বেশ কয়েকটি সারের চালান জব্দ করেছে। বিজিবি হাতেনাতে ১০-২০ কেজির বস্তাভর্তি সার জব্দ করার পর কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নজরদারি জোরদার করেছে। উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, সার পাচার রোধে ও বিতরণ ব্যবস্থায় আরও কঠোর মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সারের এই তীব্র সংকটে হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন। হ্নীলা পানখালী এলাকার কৃষক খলিল আহমদ জানান, তিনি ৪৫ কানি জমিতে আমন চাষ করেছেন। সারের জন্য ডিলারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে তিনি ক্লান্ত ও উদ্বিগ্ন। হোয়াইব্রাং এলাকার কৃষক সরোয়ার আলম ৪ একর জমিতে আমন রোপণ করে সারের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। একই এলাকার কৃষক হোছন জানান, ১০ কানি জমির বিপরীতে ডিলার তাকে মাত্র ১০-১৫ কেজি সার দিচ্ছেন, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

হ্নীলার মরিচ্যাঘোনা এলাকার জহির বৈদ্য ১০ কানি জমিতে চাষ করে মাত্র ১০ কেজি সার পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ছোট লেচুয়াপ্রাং এলাকার সিরাজ মিয়া ৫ কানি জমিতে আমন রোপণ করলেও এখনও কোনো সার পাননি। হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কম্বনিয়াপাড়ার কৃষক আব্দুস শুক্কুর সার না পেয়ে তার জমি পরিত্যক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই এলাকার কিষানি নুরুন্নাহার ৩ কানি আমন ও ১ কানি ক্ষেত খামারের জন্য এ পর্যন্ত মাত্র ১৫ কেজি সার পেয়েছেন।

উনছিপ্রাং রইক্ষ্যং এলাকার কৃষক আব্দু শুক্কুর ২ একর জমিতে চাষাবাদ করে সারের জন্য ঘুরছেন কিন্তু সার পাচ্ছেন না। রইক্ষ্যং পুটিবনিয়ার কিউ চিং চা চাকমা ৬ কানি জমিতে চাষ করেছেন। সারের সংকটে হ্নীলা থেকে খালি হাতে ফিরে অবশেষে স্থানীয় বাজার থেকে প্রতি কেজি ৪০-৪৫ টাকা দরে সার কিনতে বাধ্য হয়েছেন। কাঞ্জরপাড়ার কামাল উদ্দিন বাচ্চু ৮ কানি জমিতে ধান লাগিয়ে সারের জন্য ঘুরছেন। লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকার শাহ আলম ২০ কানি জমিতে চাষ করলেও হোয়াইক্যংয়ের ডিলার মোশতাকের কাছ থেকে এক কেজি সারও পাননি বলে অভিযোগ করেন।

টেকনাফে সার নিয়ে কৃষকদের এই হাহাকার প্রসঙ্গে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম ওসমানগনী বলেন, প্রকৃত কৃষকরা সময়মতো সার পাচ্ছেন না। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। তিনি মিয়ানমারে সার পাচারে জড়িত চোরাকারবারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা কৃষি অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। ডিলারদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। উচ্চমূল্যে সার বিক্রি ও সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। তবে কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সার মনিটরিং কমিটির সভাপতি এসএম অনীক চৌধুরী জানান, সার সংকটের বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। তবে হ্নীলা ও হোয়াইক্যংসহ টেকনাফ উপজেলায় নতুন করে ১১০ হেক্টর লবণ মাঠে ধানের আবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত ৭০ টন ইউরিয়া সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে এই সার পাওয়া গেলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। বর্তমানে হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে কোনো সংকট নেই বলে তিনি দাবি করেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাত্র কল্যাণ পরিষদের নবীনবরণ ও বিদায়

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্র কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে নবীনবরণ ও প্রবীণ বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।…

43 seconds ago

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং দমনে একরাতে ৬২৪ জন আটক

কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬২৪ জনকে আটক…

9 minutes ago

বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থার আওতায় বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গঠিত বিদ্যমান…

27 minutes ago

দেশের বাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ভরিতে ১ হাজার ৬৯১ টাকা বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।…

37 minutes ago

বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে বড় পতন

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে রাখবে—এমন আশঙ্কায় বুধবার আন্তর্জাতিক…

1 hour ago

এআই-এর যুগেও নিজের অবস্থানে অনড় ‘লিপস্টিক কিং’ লি জিয়াকি

চীনের লাইভস্ট্রিম শপিং খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের মুখেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন সুপারস্টার লি…

1 hour ago

This website uses cookies.