Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

দেশজুড়ে আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে খুন, ৭ মাসে ২০৭৬ হত্যাকাণ্ড

সারা দেশে আশঙ্কাজনকহারে খুনাখুনি বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক কোন্দল, দখল, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, আন্ডারওয়ার্ল্ডের লড়াই, কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্ব, জমি দখল এবং পারিবারিক ও সামাজিক কলহের জেরে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। এতে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ও প্রশাসন এক ধরনের অস্বস্তিতে রয়েছে। অপরাধীরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠলেও মাঠ পর্যায়ে পুলিশকে সক্রিয় করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একাধিক উদ্যোগের পরও খুনাখুনি থামানো যাচ্ছে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে মোট ২,০৭৬ জন মানুষ খুনের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর থেকে অপরাধের এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পেয়েছে অথবা দেশে ফিরেছে। বিদেশে নিষ্ক্রিয় থাকা অপরাধীরাও নতুন করে সক্রিয় হয়ে তাদের অনুগতদের দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রকাশ্য হানাহানিতে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে।

পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সারা দেশে খুন হয়েছে ২৮৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাই মাসে ২৯৮ জন। জুলাই মাসের ২৯৮টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২১ জন গণপিটুনিতে এবং ১১ জন রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। প্রতিটি ঘটনার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কিছুটা কম হলেও পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে ৩৬২টি এবং জুন মাসে ৩৪৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছিল।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সামাজিক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক খুনের ঘটনাও বেড়েছে। গত সাত মাসে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে সারা দেশে ৭৫ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই বিএনপির নেতাকর্মী। গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে নিজ বাড়ির সামনে যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারকে (৫১) মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। এরপর ১৩ জুন রাউজান উপজেলার একটি জনাকীর্ণ বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে আরেক যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৭ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে পোশাককর্মী বর্ষা আক্তারকে (২০) গলা কেটে হত্যা করে তার স্বামী মামুন, যার কারণ ছিল স্বামীর পরকীয়া ও একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক। ৮ মে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে পারিবারিক কলহে কোদালের আঘাতে খুন হন গৃহবধূ মাহিনুর আক্তার (২৪)। একই দিন চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় হাসান রাজু নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়, যেখানে চোখে গুলি লেগে গুরুতর আহত হয় ১১ বছরের শিশু রেশমি।

গত ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। ওই দিনই গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক বাড়ি থেকে শারমিন আক্তার, তার তিন সন্তান এবং রসুল মিয়া নামের এক ব্যক্তিসহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া ও পারিবারিক কলহের জেরে শারমিনের স্বামী ফোরকান এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ৬ আগস্ট ঢাকার সবুজবাগে ছুরাইয়া আক্তার (২১) নামের এক তরুণীর খণ্ডিত লাশ, ২০ আগস্ট খুলনার বটিয়াঘাটায় এক নারীর লাশ এবং ২২ আগস্ট রংপুরের কামালকাছনায় একই পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় অপরাধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে দিনের আলোতেই ছিনতাই ও খুনের ঘটনা ঘটছে। ঢাকার বাইরে খুলনা অঞ্চলেও খুনের ঘটনা অনেক বেশি। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহদাত হোসাইন জানান, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে পুলিশ তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তবে অপরাধ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত খুনের ঘটনা বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে শিথিলতা বা ধীরগতি থাকলে অপরাধীরা সেই সুযোগ নেয়। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ের খুনাখুনিতে অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্রের ব্যবহারের আশঙ্কা করছে প্রশাসন। জুলাই বিপ্লবের সময় বিভিন্ন থানা ও ব্যারাক থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাহিনীর অন্তত ১,৩১১টি অস্ত্র এখনও নিখোঁজ রয়েছে, যার মধ্যে এসএমজি, চায়না রাইফেল ও পিস্তল রয়েছে। এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য বেসামরিক নাগরিকদের পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হলেও খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা পুলিশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪: ৪১আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪: ৪৫

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

সিংগাইরে মদ্যপ অবস্থায় মারামারি, চিকিৎসাধীন যুবকের মৃত্যু

মানিকগঞ্জের সিংগাইরে মদ্যপ অবস্থায় মারামারির ঘটনায় গুরুতর আহত আলমগীর হোসেন (২৭) নামের এক যুবক চিকিৎসাধীন…

12 minutes ago

২৯ আগস্ট থেকে চুয়াডাঙ্গায় আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা

চুয়াডাঙ্গায় বিভিন্ন রুটে আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দাবি আদায় না হলে ৩১…

1 hour ago

আষাঢ়িয়ারচর ব্রিজে ফাটল: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ উপজেলার আষাঢ়িয়ারচর ব্রিজের ফাটল মেরামতের কাজের কারণে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত…

2 hours ago

রূপপুর প্রকল্পে লিফট থেকে পড়ে শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করার সময় লিফট থেকে পড়ে উজ্জ্বল খন্দকার…

2 hours ago

কুলাউড়ায় এনসিপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১০, গ্রেপ্তার ৫

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে…

2 hours ago

নারায়ণগঞ্জে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনা ও পানিতে ডুবে ৩ জনের মৃত্যু

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন এবং আড়াইহাজারে পুকুরের পানিতে ডুবে সাত বছর বয়সী…

2 hours ago

This website uses cookies.