Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

ঋণের বোঝা আর অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে দিশেহারা রুমানা আক্তার

‘আমার জীবনটাই দুঃখে দুঃখে গেল। কোথায় যাব, কী করব জানি না’—কথাগুলো বলতে বলতেই বারবার চোখ মুছছিলেন রুমানা আক্তার। কয়েক মাস আগেও তাঁর বিশ্বাস ছিল, বিদেশে যাওয়া স্বামী ফিরোজ মিয়া ফিরবেন, ঋণ শোধ হবে, সংসারের কষ্ট কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছে স্বামীর মৃত্যুসংবাদে। এখন স্বামী নেই, ঋণের বোঝা রয়ে গেছে। এরই মধ্যে এক মেয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত, আর বড় মেয়ে ফারজানা আক্তার (১৬) দেড় মাস ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ, এর মধ্যে আবার হামে আক্রান্ত। একের পর এক বিপর্যয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই দুশ্চিন্তায় দিন-রাত কাটছে রুমানার।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড–১৯ হাসপাতালে বড় মেয়ে ফারজানাকে নিয়ে এসেছিলেন রুমানা আক্তার। পাশে আরেকটি বেঞ্চে বসে নীরবে কাঁদছিলেন তাঁর মা শরীফা বেগম (৬৫)। গতকাল শনিবার আবার ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে দেখা যায়, একটি বেডে চিকিৎসাধীন ফারজানা আক্তার। তার পাশে বসে আছেন মা রুমানা আক্তার ও নানি শরীফা বেগম। ফারজানা হামের চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও মানসিকভাবে এখনো অসুস্থ। হাসপাতাল থেকে বারবার বের হয়ে যেতে চায়। ফলে পরিবারের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন তার মানসিক অসুস্থতা।

রুমানা আক্তার জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছে ফারজানা। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার বাড়িতে রেখে সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা চলছিল। গত বুধবার তার মানসিক অবস্থার অবনতি হলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা ফারজানার শরীরে হামের উপসর্গ দেখতে পান। এরপর তাকে পাঠানো হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে জানানো হয়, প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। পরে তাঁরা ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড–১৯ হাসপাতালে আসেন। তিন দিন চিকিৎসার পর ফারজানার হামের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও মানসিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি।

বড় মেয়ের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও রুমানা আক্তারের মনে বারবার ফিরে আসে ছোট মেয়ে ফাহিমা আক্তারের কথা। তার বয়স ১০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত এই শিশুকে নিয়ে রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে হয়েছে। সবচেয়ে ছোট ছেলে আবদুর রহমানের বয়স মাত্র তিন বছর। তাদের দুজনকে বাসায় দাদির কাছে রেখে এসেছেন।

রুমানা আক্তার জানান, মেয়ে ফাহিমার চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে ঋণের বোঝায় পড়েন। দেশের আয়ে সেই ঋণ পরিশোধ সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত আরও ঋণ করে সংসারের ভাগ্য বদলানোর আশায় কাতারে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী মো. ফিরোজ মিয়া। কিন্তু দেশে যাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায়, প্রায় ৯ মাস আগে কাতারের একটি কারখানায় কাজ করার সময় মারা যান ফিরোজ মিয়া। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মরদেহ দেশে ফিরলেও তাঁর সঙ্গে ফেরেনি পরিবারের স্বপ্নগুলো। যে ঋণ শোধ করতে বিদেশে গিয়েছিলেন, সেই ঋণ রয়ে গেছে পরিবারের কাঁধে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমানা বলেন, ‘আমি ভাই অনেক দুঃখী। আমার স্বামী নেই। নিজের কোনো ভাই নেই। স্বামীরও কোনো ভাই নেই। বাবাও নেই। আমাদের দেখার মতো কেউ নেই। অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। বিধবা ভাতার জন্য গিয়েছিলাম, সেখানেও আমার নাম নেয়নি।’ তিনি জানান, কাতারের যে কারখানায় তাঁর স্বামী কাজ করতেন, সেখান থেকেও কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা পাননি। ফলে বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ এখনো শোধ করতে পারেননি। পাওনাদারদের চাপ যেমন রয়েছে, তেমনি দুই মেয়ের চিকিৎসার খরচও থেমে নেই।

রুমানা বলেন, ‘আমার শ্বশুরের কোনো জায়গাজমি ছিল না। শাশুড়ি তাঁর বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া জায়গায় ঘর করে থাকতেন। এখন আমরাও সেখানেই থাকি। জায়গাজমি থাকলে হয়তো বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে পারতাম। এখন সেই সুযোগও নেই।’ কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ আবার ভিজে ওঠে। কিছুক্ষণ পর উঠে মেয়ের শয্যার পাশে গিয়ে বসেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তারপর চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন মেয়ের মুখের দিকে। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে ক্যানসারে আক্রান্ত এক মেয়ের চিকিৎসা, মানসিকভাবে অসুস্থ বড় মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর ছোট শিশুকে নিয়ে সংসার—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই এখন নতুন এক সংগ্রাম রুমানা আক্তারের জন্য। সামান্য সেলাইয়ের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

সেগুনবাগিচায় সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের দেয়ালে সারিবদ্ধ গাড়ির দখল

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমি-সংলগ্ন ফুটপাতে বরেণ্য ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি সংবলিত দেয়াল থাকলেও তা এখন সারি সারি…

4 minutes ago

সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম কেনায় শত কোটি টাকা দুর্নীতির অনুসন্ধান

জাতীয় সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন ও সংস্কারের নামে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ‘কমিউনিকেশন…

9 minutes ago

লালমোহনে নজরুল বর্ষ ২০২৬ উদযাপন, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মুখর অনুষ্ঠান

ভোলার লালমোহনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও আদর্শ প্রচারের লক্ষ্যে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬’…

30 minutes ago

কুমিল্লার প্রত্যন্ত গ্রামেও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, গ্রেপ্তার ৩

কুমিল্লা শহর ছাড়িয়ে জেলার মনোহরগঞ্জ ও চৌদ্দগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। ‘পিএক্স…

46 minutes ago

শিক্ষা খাতের তথ্য আদান-প্রদানে ইসির সঙ্গে বৈঠক রোববার

শিক্ষা খাতের তথ্য-উপাত্ত আদান-প্রদানে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ও বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও…

50 minutes ago

আইনগত সহায়তা প্রান্তিক মানুষের বিচারপ্রাপ্তি সহজ করবে: আইনমন্ত্রী

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর…

55 minutes ago

This website uses cookies.