Header Premium (728×90)

দাসপ্রথার করুণ ইতিহাস: উত্থান, বিস্তার ও বিলোপের সংগ্রাম

মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম অমানবিক প্রথা ছিল দাসপ্রথা। হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতা, সাম্রাজ্য ও উপনিবেশে মানুষকে সম্পত্তির মতো কেনাবেচা করা হতো। যুদ্ধবন্দি, ঋণগ্রস্ত বা অপহৃত মানুষকে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত রাখা হতো এবং তাদের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। দীর্ঘ আন্দোলন, বিদ্রোহ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ প্রথার অবসান ঘটে।

দাসপ্রথা এমন একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে একজন মানুষ অন্য একজন ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন। দাসদের কেনাবেচা করা যেত, উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তর করা হতো এবং মালিকের অনুমতি ছাড়া তারা কোথাও যেতে বা নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। ইতিহাসবিদদের মতে, দাসপ্রথার সূচনা প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার বছর আগে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিস ও রোমান সভ্যতার সময়। যুদ্ধবন্দিদের শ্রমে ব্যবহার থেকেই এ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটে। পরে এটি ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

১৫শ শতাব্দী থেকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আফ্রিকা থেকে লাখ লাখ মানুষকে ধরে বা কিনে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে নিয়ে যেতে শুরু করে। ইতিহাসে এটি ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্য নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, ১৫শ থেকে ১৯শ শতাব্দীর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ আফ্রিকানকে জোরপূর্বক দাস হিসেবে জাহাজে তোলা হয়েছিল। তাদের মধ্যে বহু মানুষ সমুদ্রযাত্রার সময়ই প্রাণ হারান। দাসদের পরিবার ভেঙে বিক্রি করে দেওয়া, সন্তানদের আলাদা করে নেওয়া এবং মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা ছিল এ ব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা।

১৮শ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় দাসপ্রথার বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে ওঠে। উইলিয়াম উইলবারফোর্স, থমাস ক্লার্কসনসহ বহু সমাজসংস্কারক ও মানবাধিকারকর্মী এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। একই সময়ে দাসদের বিভিন্ন বিদ্রোহও দাসপ্রথা বিলোপের দাবিকে আরও জোরালো করে।

দাসপ্রথার অবসান একদিনে হয়নি; বিভিন্ন দেশে ভিন্ন সময়ে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৮০৭ সালে ব্রিটেন দাস বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে। ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট Slavery Abolition Act পাস করে এবং ১৮৩৪ সালের ১ আগস্ট থেকে অধিকাংশ ব্রিটিশ উপনিবেশে দাসপ্রথা বিলোপ কার্যকর হয়। ১৮৪৮ সালে ফ্রান্স তাদের উপনিবেশে দাসপ্রথা বিলোপ করে। ১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে। ১৮৮৬ সালে কিউবা এবং ১৮৮৮ সালে ব্রাজিল দাসপ্রথা বিলোপ করে। ব্রাজিল ছিল পশ্চিমা বিশ্বের শেষ দেশ, যেখানে আইনিভাবে দাসপ্রথার অবসান ঘটে।

দাসপ্রথা শুধু একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল না; এটি ছিল মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার হরণের এক ভয়াবহ অধ্যায়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা আজও আধুনিক দাসত্ব, মানবপাচার ও জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে কাজ করছে। দাসপ্রথার ইতিহাস মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম কখনো থেমে থাকে না।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একা লড়ার পথে জামায়াত, অন্য দলগুলোর ভিন্ন চিন্তা

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে না গিয়ে এককভাবে অংশ নেওয়ার চিন্তা করছে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে,…

9 minutes ago

১৮ মাস বিচারকহীন পটিয়া চৌকি আদালত, ৯ হাজার মামলা জটে স্থবির

চট্টগ্রামের পটিয়া চৌকি আদালতের অধীনে আনোয়ারা ও চন্দনাইশ উপজেলার আদালতে দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে বিচারক…

10 minutes ago

দেশের ৭ অঞ্চলে দুপুরের মধ্যে ঝড়ের শঙ্কা, নদীবন্দরে সংকেত

দেশের সাতটি জেলায় দুপুরের মধ্যে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে…

27 minutes ago

পুঁজিবাজারের সব প্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ ডিএসইর সাবেক সিআরও খায়রুল বাশার

দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগে ডিএসইর সাবেক সিআরও মো. খায়রুল বাশারকে…

40 minutes ago

তীব্র তোপের মুখে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের পরিকল্পনা বাতিল করল ফিফা

তীব্র সমালোচনার মুখে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ও আয়োজক কার্যক্রমে অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে ফিফা।…

42 minutes ago

কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ৩ ও আহত ১৫

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৩ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত…

58 minutes ago

This website uses cookies.