নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট হারে নিশ্চিত মুনাফা পাওয়ার সুবিধার কারণে বাংলাদেশে পোস্ট অফিস সঞ্চয় প্রকল্প ও সঞ্চয়পত্র অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, প্রবাসী ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখানে টাকা জমা রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তবে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সঞ্চয় প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত ‘লভ্যাংশ’ বা মুনাফা হালাল নাকি তা সুদ বা রিবার অন্তর্ভুক্ত—এ নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে।
ইসলামি ফিকহ বা আইনশাস্ত্র অনুযায়ী, কোনো মুনাফা হালাল হওয়ার জন্য বিনিয়োগে প্রকৃত ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং অংশীদারত্ব থাকা আবশ্যক, যেমনটি মুদারাবা বা মুশারাকা পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। যেখানে লাভ ও লোকসান উভয়েরই সমান সম্ভাবনা থাকে। হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-হিদায়া’ এবং ‘ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি’তে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ও ঋণচুক্তির মধ্যকার এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া ইবনে আবেদীন শামীর ‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, ঋণচুক্তির বিপরীতে যেকোনো ধরনের শর্তযুক্ত বাড়তি অর্থ গ্রহণ করা সরাসরি রিবা বা সুদ হিসেবে গণ্য হবে, তার পরিমাণ যত সামান্যই হোক না কেন।
পোস্ট অফিস সঞ্চয়পত্র ও সঞ্চয় হিসাবের পুরো কাঠামোটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে গ্রাহক মূলত সরকারকে টাকা ধার দিচ্ছেন। বিনিময়ে কোনো ব্যবসায়িক ঝুঁকি বা লাভ-ক্ষতির অংশীদারত্ব ছাড়াই পূর্বনির্ধারিত ও নিশ্চিত হারে বাড়তি অর্থ বা মুনাফা পাচ্ছেন। অধিকাংশ ফিকহবিদের মতে, এটি প্রকৃতপক্ষে একটি ঋণচুক্তি (কর্জ) এবং এর ওপর নির্ধারিত বাড়তি অর্থ হলো সুদ। সমকালীন বিশিষ্ট ইসলামি অর্থনীতিবিদ মুফতি তাকী উসমানী তার ‘ইসলাম অ্যান্ড মডার্ন ইকোনমিকস’ গ্রন্থে এই ধরনের সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পকে সুদভিত্তিক লেনদেনের অন্তর্ভুক্ত বলে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন।
সুদের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারার ২৭৫ থেকে ২৭৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সুদকে হারাম এবং ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করেছেন। এমনকি সুদের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুরা আলে ইমরানের ১৩০ নম্বর আয়াতেও চক্রবৃদ্ধি সুদ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ রয়েছে। হাদিস শরিফেও সুদের ভয়াবহতা বর্ণিত হয়েছে। সহিহ মুসলিমে উল্লেখ আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদ দাতা, গ্রহীতা, সুদের চুক্তি লেখক এবং এর সাক্ষী—সবার ওপর অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন তারা সবাই সমান অপরাধী। জামে তিরমিযি ও সুনানে আবু দাউদেও সুদকে অন্যতম বড় কবিরা গুনাহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই কুরআন ও হাদিসের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফতোয়া বোর্ড ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলো পোস্ট অফিসের এই মুনাফাকে সুদ হিসেবে ফতোয়া দিয়েছে। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সঞ্চয়পত্র, পোস্ট অফিস স্কিম ও ব্যাংকের এফডিআরের নির্দিষ্ট মুনাফাকে সুদ বলে আসছে। পাকিস্তানের জামিয়া আশরাফিয়া লাহোর এবং করাচির দারুল উলুম করাচিও একই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। বাংলাদেশের আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীসহ দেশের প্রধান প্রধান কওমি মাদ্রাসার ফতোয়া বিভাগও একমত যে, পোস্ট অফিসের সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট হারের মুনাফা সুদের অন্তর্ভুক্ত এবং তা গ্রহণ করা জায়েজ নয়। এছাড়া মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া কমিটি এবং ওআইসির অধীনে পরিচালিত জেদ্দাভিত্তিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি ব্যাংক আমানত ও সরকারি বন্ডের নির্দিষ্ট সুদকে রিবা হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিছু আধুনিক চিন্তাবিদ একে ‘মূল্যস্ফীতির ক্ষতিপূরণ’ বলার চেষ্টা করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের কাছে এই মত গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
তবে মূল আসল টাকা এবং অতিরিক্ত মুনাফার ব্যবহার নিয়ে আলেমদের মধ্যে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। প্রায় সব আলেমের মতে, নিজের মূল আসল টাকা ফেরত নেওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ, কারণ তা নিজের বৈধ সম্পদ। কিন্তু অতিরিক্ত হিসেবে প্রাপ্ত মুনাফা বা সুদের টাকা নিজের কোনো প্রয়োজনে বা ভোগে ব্যবহার করা যাবে না। এই বাড়তি টাকা সওয়াবের নিয়ত ছাড়াই গরিব-দুঃখী, এতিম বা সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজে দান করে দিতে হবে। দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ এবং ‘বাহিশতী জেওর’সহ বিভিন্ন ফিকহি গ্রন্থে বলা হয়েছে, এই দান মূলত কোনো সদকা নয়, বরং নিজের কাছে চলে আসা হারাম সম্পদ থেকে আত্মশুদ্ধি অর্জনের একটি উপায় মাত্র। তাই এতে কোনো সওয়াবের আশা করা যাবে না।
অনেক সময় সুদমুক্ত বিকল্প সঞ্চয় মাধ্যমের অভাব এবং মূল্যস্ফীতির কারণে টাকার মান কমে যাওয়ার অজুহাত দেওয়া হয়। তবে সমসাময়িক আলেমদের মতে, এই বাস্তবতা সুদ গ্রহণের বৈধতা দিতে পারে না। এর পরিবর্তে তারা মুসলিম উম্মাহকে ইসলামি ব্যাংকিং, শরিয়াহভিত্তিক মুদারাবা সঞ্চয় প্রকল্প এবং ওয়াকফভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দেন। সামগ্রিকভাবে, পোস্ট অফিস সঞ্চয়পত্র বা সঞ্চয় হিসাবে টাকা রেখে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা নেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম। জমাকৃত আসল অর্থ ফেরত নেওয়া যাবে, তবে অতিরিক্ত মুনাফা ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় না করে সওয়াবের আশা ছাড়া দান করে দিতে হবে। যেকোনো ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজ এলাকার নির্ভরযোগ্য কোনো মুফতি বা ফতোয়া বোর্ডের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শ করা বাঞ্ছনীয়।
দক্ষিণ ইংল্যান্ডের ইস্ট সাসেক্সে প্রায় ১৫০ জন যাত্রী নিয়ে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে অন্তত ১৮…
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামরিক ভূমি ও ক্যান্টনমেন্ট অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৭টি পদে ৮৬ জন শিক্ষক…
সারাদেশে সিএনজি পাম্পগুলোতে চলমান অসহনীয় জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে স্পষ্ট বক্তব্য ও দ্রুত কার্যকর…
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় ডজনপ্রতি ডিমের দাম ১০ টাকা কমে ১৪০ টাকায় বিক্রি…
ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন বাঁহাতি ওপেনার…
মধ্যপ্রাচ্যে রেকর্ড ২৬০ দিনের বেশি সময় ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের…
This website uses cookies.