Header Premium (728×90)

তাকলামাকান মরুভূমিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তাইওয়ানের নকল বানিয়ে চীনের মহড়া

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা সেনাবাহিনী তাদের দেশের প্রত্যন্ত তাকলামাকান মরুভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, নৌঘাঁটি এবং তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের হুবহু প্রতিরূপ বা রেপ্লিকা নির্মাণ করে সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাইওয়ান দখল এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই মহড়া পরিচালনা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আরলি বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজের একটি ত্রিমাত্রিক (৩ডি) প্রতিরূপ নির্মাণ শুরু হয়, যা তিন মাসের মধ্যে প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। সমুদ্র থেকে ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরের এই মরুভূমিতে নির্মিত প্রতিরূপটিতে মূল জাহাজের মাস্ট ও রাডারসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো সংযোজন করা হয়েছে, যাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বাস্তবসম্মত অনুশীলন করা সম্ভব হয়।

চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) শুধু মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং যুদ্ধবিমান ও নৌঘাঁটিরও প্রতিরূপ তৈরি করেছে। এর মধ্যে জাপানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ইয়োকোসুকা নৌঘাঁটির প্রতিরূপও রয়েছে, যেখানে ৫৫ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিচার বিভাগের হুবহু প্রতিরূপও সেখানে দৃশ্যমান। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক শন ও’কনরের মতে, সেনারা যেন তাইপের রাস্তায় অবস্থান করছে—এমন পরিবেশে অভিযানের অনুশীলনের জন্যই এসব তৈরি করা হয়েছে। গত বছরের স্যাটেলাইট চিত্রে তাইওয়ানের সরকারি ভবনের প্রতিরূপের নিচে প্রায় ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলও দেখা গেছে, যা নেতাদের ভূগর্ভস্থ পথে পালানোর পরিস্থিতির অনুশীলনের জন্য হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তাকলামাকান মরুভূমির এই প্রশিক্ষণ এলাকায় প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ রয়েছে, যার ওপর রেলগাড়িতে বসানো নকল যুদ্ধজাহাজ টেনে নিয়ে গিয়ে জাহাজবিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ২০২১ সালের অক্টোবরে তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে একটি লক্ষ্যবস্তু প্রায় অক্ষত অবস্থায় দেখা গেলেও সর্বশেষ ছবিতে সেটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেখা গেছে। এছাড়াও সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড বিমানবাহী রণতরী এবং এফ-২২, এফ-১৬ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রতিরূপও রয়েছে। একটি রানওয়ের পাশে দুই সারিতে সাজানো এফ-২২ এর প্রতিরূপের মধ্যে অন্তত চারটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্য ইন্টেল ল্যাবের গবেষক ড্যামিয়েন সাইমন জানান, এসব স্থাপনার নিখুঁততা প্রমাণ করে যে চীন নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি আরও জানান, এই মহড়াগুলো নিয়ন্ত্রিত কোনো প্রদর্শনী নয়, বরং বহু কিলোমিটার দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, চীন এখানে ওয়াইজে-২১, ওয়াইজে-১৭ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ডিএফ-২৭ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাচ্ছে।

জাপানের ইয়োকোসুকা নৌঘাঁটির প্রতিরূপের পাশে ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের গর্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধজাহাজও দেখা গেছে। এছাড়া তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সু’আও নৌঘাঁটির প্রতিরূপও চীন নির্মাণ করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কিড-ক্লাস ডেস্ট্রয়ারের একটি প্রতিরূপ রাখা হয়েছে। স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সেখানে একটি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানো হয়, যাতে জেটি এবং লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত একটি কাঠামো ধ্বংস হয়। পাহাড়বেষ্টিত সু’আও ঘাঁটিতে আঘাত হানতে বিশেষ কোণে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অনুশীলনের জন্যই চীন এই প্রতিরূপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, ২০০২ সালে নির্মিত তাইওয়ানের বিমানঘাঁটির প্রতিরূপটি চীনের সবচেয়ে পুরোনো সামরিক অনুকরণগুলোর একটি, যা মূলত মরুভূমির বালিতে আঁকা রানওয়ের রেখা দিয়ে তৈরি এবং জিউছুয়ান স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের পাশে অবস্থিত হওয়ায় অস্ত্র পরীক্ষা ও বোমাবর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

রাজধানী দখলের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চীন তাইপের বো’আই বিশেষ প্রশাসনিক এলাকার দুটি আলাদা প্রতিরূপ তৈরি করেছে। ২০১৪ সালে নির্মিত একটি প্রতিরূপ সরকারি ভবনগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি, যাতে স্থলবাহিনী রাজধানী দখলের অনুশীলন করতে পারে। অন্যটি ইনার মঙ্গোলিয়ার মরুভূমিতে নির্মিত, যেখানে তাইপের রাস্তা, মোড় এবং ব্লকের বিন্যাস হুবহু অনুসরণ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে পিএলএ সদস্যদের প্রেসিডেন্ট ভবনের প্রতিরূপের সামনে গুলি চালানো এবং ভবনটির দিকে অগ্রসর হওয়ার মহড়া দিতে দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামরিক প্রস্তুতির মাধ্যমে চীন শুধু তাদের সক্ষমতাই বাড়াচ্ছে না, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও তাইওয়ানের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তাও বটে। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক সাবমেরিন কমান্ডার থমাস শুগার্ট বলেন, এর মাধ্যমে চীন জাপানকে সংঘাতের অংশ হওয়ার পরিণতির কথা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মে মাসে চীনের এই নজিরবিহীন সামরিক সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অধিকাংশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের মতে, মার্কিন সহায়তা ছাড়া তাইওয়ানের পক্ষে স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা কঠিন এবং চীনের এই মহড়াগুলো তাইওয়ান প্রণালীতে উত্তেজনার নতুন ইঙ্গিত বহন করছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

জেড ক্যাটাগরির পাওয়ার গ্রিড কেন ডিএস৩০ সূচকে, উঠছে প্রশ্ন

টানা তিন বছর লোকসানে থাকা এবং লভ্যাংশ দিতে না পারায় বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানি…

3 minutes ago

মার্কিন ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার অধিকার রাখে ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীকে সামরিক সুবিধা দেওয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরান পাল্টা আঘাত হানার অধিকার রাখে…

17 minutes ago

আ.লীগের ভবিষ্যৎ বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কোনো প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে নয়, বরং…

33 minutes ago

দুর্যোগের সময় মহান আল্লাহর আশ্রয় ও ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্ব

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কেবল সুরক্ষা-ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, বরং আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ এবং তওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে তাঁর…

48 minutes ago

মঙ্গলের অভিজ্ঞতা পেতে স্বেচ্ছাসেবক খুঁজছে নাসা

মঙ্গলের প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের টিকে থাকার সক্ষমতা যাচাই করতে নাসা শুরু করতে যাচ্ছে 'মুন অ্যান্ড…

1 hour ago

নেত্রকোনায় লাইব্রেরির জমি থেকে আ.লীগের কার্যালয় উচ্ছেদ

নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌর শহরে কুমার দ্বীজেন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরির জায়গা থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় উচ্ছেদ…

2 hours ago

This website uses cookies.