বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামে, হয়তো এমন এক বিকেলে যখন নদীর জল পুরোনো কোনো নাম মনে করে ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে আসে, আল মাহমুদ তার গল্পের মানুষদের দেখতে পেয়েছিলেন। কেউ নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল, কেউ বাড়ি ফিরছিল, কেউ বা মনে করছিল কোনো অপ্রকাশিত প্রেমের কথা। তারা কেউ জানত না যে, তাদের এই ছোট ছোট জীবনের ভেতর দিয়েই একদিন একটি দেশের দীর্ঘ ইতিহাস হেঁটে যাবে। আল মাহমুদ বলেছিলেন, “সব সময় আমার চেষ্টা ছিলো আমি যেমন ঠিক তেমনই লিখবো।” লেখকের এই সহজ স্বীকারোক্তির পেছনেই লুকিয়ে ছিল তার সাহিত্যিক দর্শনের মূল ভিত্তি। তার কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি দেশ ছিল না; এটি ছিল মানুষের মুখের ভাষা, নদীর গন্ধ, ভেজা মাটি, নৌকার দড়ি, শস্যের মাঠ, উঠানের আলো এবং বহু প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো গল্পের সমষ্টি।
তার গল্পের গ্রামগুলোকে মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে না, অথচ সেগুলো এতই বাস্তব যে মনে হয় একটু হাঁটলেই কোনো বাঁশবাগানের পাশে তাদের দেখা মিলবে। সেখানে যৌবন ভুলে যাওয়া কোনো বৃদ্ধ নদীর পুরোনো গতিপথ মনে রেখেছেন, কিংবা কোনো নারী এমন অপেক্ষায় বসে আছেন যার শেষ হওয়ার কথা কেউ জানে না। কোথাও একটি নৌকা ঘাটে বাঁধা, অথচ তার মাঝি বহু বছর আগে মারা গেছে। আল মাহমুদের গল্পের পৃথিবীতে এমন ঘটনাকে অসম্ভব মনে হয় না, কারণ গ্রামের মানুষ জানে—মৃতরা চলে গেলেও তাদের স্মৃতি কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না। তিনি বলেছিলেন, “আমি আমার পরিবেশ থেকে শব্দ ব্যবহার করেছি। এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছি যা আগে ব্যবহার করেনি।” তার এই শব্দচয়ন বইয়ের অভিধানের চেয়ে মানুষের মুখ থেকে বেশি সংগৃহীত, যা তার লেখায় একটি ভূগোলের স্মৃতি বহন করে।
তার লেখায় মানুষ তার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; তারা নদীর মতোই পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। ‘কাবিলের বোন’, ‘পুরুষ সুন্দর’, ‘নিশিন্দা নারী’, ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘জলবেশ্যা’, ‘গন্ধবণিক’ কিংবা ‘তুষের আগুন’-এর মতো রচনায় তাদের প্রেমের পাশে সামাজিক বিধি, আকাঙ্ক্ষার পাশে ভয় এবং বিশ্বাসের পাশে প্রশ্ন বিদ্যমান। আল মাহমুদ বলেছিলেন, “আমার সৌভাগ্য যে জীবনের একটা অনুশীলনের সময়ে আমি গ্রামাঞ্চলে কাটিয়েছি।” এই অভিজ্ঞতা তাকে লোকসংস্কৃতি, নদী, নৌকা, পশুপাখি এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান শিখিয়েছিল। তার প্রকৃতি কোনো নীরব ছবি নয়; সেখানে বৃষ্টি মানে অপেক্ষা, কুয়াশা মানে আড়াল, নদী মানে বিচ্ছেদ ও প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা, আর মাটি মানে মানুষের শেষ আশ্রয়।
আল মাহমুদের গল্পে সময় গোল হয়ে ঘোরে; অতীত কখনো অতীত হয়ে থাকে না, বরং বর্তমানের ঘরে এসে বসে। তার মতে, “আমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি লেখায় মানুষের সৃজন ক্ষমতাকে। এই জন্য একটা আঙ্গিক দরকার হয়।” তার সাহিত্যিক শক্তি সাধারণ মানুষের জীবনের গভীরতা দেখার মধ্যে, যেখানে কৃষক, নারী, শ্রমজীবী কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত মানুষগুলো কোনো মহাকাব্যের নায়ক না হয়েও একটি সমাজের পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে ওঠে। তিনি আধুনিকতা বলতে শিকড় ভুলে যাওয়াকে বোঝাননি, বরং তার লেখার আকাঙ্ক্ষা ছিল আধুনিকতার সঙ্গে মাটির কথোপকথন ঘটানো।
তিনি বলেছিলেন, “তবু পায়ের নিচের মাটিটা তো বাংলাদেশ।” এই কথাটিই তার সমগ্র সাহিত্যকে সংজ্ঞায়িত করে। তার গল্পের গ্রাম স্বর্গ নয়, সেখানে ভালোবাসার পাশাপাশি হিংসা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা আছে। তার নিজের জীবনেও ছিল বিরাট সংসারের ভার ও সংগ্রামের ছাপ, যা তার অসমাপ্ত লেখার অংশ হয়ে থেকেছে। আল মাহমুদের সাহিত্যের বড় জাদু হলো, তার গল্পের নদী বা অচেনা নারীর অপেক্ষার মধ্যে পাঠক নিজের পরিচিত মুখ খুঁজে পায়। তিনি আমাদের এমন এক বাংলাদেশ দেখিয়েছেন, যা মানচিত্রের বাইরে মানুষের স্মৃতিতে, সন্ধ্যার আজানে, আর নৌকার দুলুনিতে বেঁচে থাকে। রাত গভীর হলে কোনো নদীর ওপারে দেখা যাওয়া নৌকার আলো কেবল আলো নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি মানুষের জীবন, একটি স্মৃতি এবং একটি দেশ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, জাতিসংঘ নিখুঁত নয়, তবে এটি অপরিহার্য এবং…
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতির দাবি করা হলেও বাস্তবে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও…
ইউনিসেফের তথ্যমতে, পাকিস্তানে গত এক বছরে আনুমানিক ১৫ লাখ শিশু অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।…
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গাজা নিয়ে বিশ্ববাসীর নিষ্ক্রিয়তাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল…
গাইবান্ধা সরকারি কলেজে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে।
ময়মনসিংহে বিএনপির প্রতিবাদ সমাবেশে আওয়ামী লীগের যেকোনো ধরনের চক্রান্ত ও নৈরাজ্য স্থানীয়ভাবে প্রতিহত করার এবং…
This website uses cookies.