Header Premium (728×90)

Categories: শিক্ষা

হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি পাওয়া প্রথম বাঙালি নারী রওনক জাহানের লড়াই

এমন এক সময় ছিল যখন মেয়েদের পড়াশোনার জন্য সমাজ থেকে আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হতো। এমনকি ছেলেদের স্কুলে ভর্তি হয়েও ক্লাসে বসার অধিকার মিলত না মেয়েদের। সেই বৈরী সময়ে দাঁড়িয়েই নিজের জন্য এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন বুনেছিলেন এক কিশোরী, যেখানে শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো লিঙ্গভেদ থাকবে না। বাবার অকুন্ঠ সমর্থন, নিজের মেধা আর বৃত্তির সুযোগ—এই তিনের সমন্বয়ে তিনি নিজের পথ তৈরি করেছিলেন। তিনি রওনক জাহান, যিনি ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি সম্ভবত হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করা প্রথম বাঙালি নারী।

১৯৪৪ সালে জন্ম নেওয়া রওনক জাহানের শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ছোট-বড় শহরে, যার মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা, বাগেরহাট, ভোলা ও মুন্সিগঞ্জ। পঞ্চাশের দশকে এসব মফস্বল শহরে স্কুলে পড়ার সময়ই তাঁর মনে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দানা বাঁধে। তবে স্বপ্ন পূরণের পথটি সহজ ছিল না। ভোলার একটি বয়েজ স্কুলে পড়ার জন্য তাঁর বাবা তাঁকে ভর্তি করিয়ে দিলেও তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় ক্লাসরুমে বসার অনুমতি পাননি তিনি। নিয়মের ফাঁক গলে ভর্তি হওয়া এই মেয়েটিকে কেবল পরীক্ষার সময় আলাদা একটি কক্ষে বসে পরীক্ষা দিতে হতো। তবে এই প্রতিবন্ধকতা তাঁকে থামাতে পারেনি, বরং দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের সেরা বিদ্যাপীঠে পড়ার জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

রওনক জাহানের শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল সম্পূর্ণ দেশীয় ও বাংলা মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার আগে তিনি বিভিন্ন শহরের বাংলা মাধ্যম স্কুলেই পড়াশোনা করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে বিএ (সম্মান) এবং ১৯৬৩ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে এমএ সম্পন্ন করেন। তাঁর স্নাতক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে ইতিহাস ও অর্থনীতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আজকের মতো ছিল না। রওনক জাহান পরবর্তী সময়ে স্মৃতিচারণ করে জানান, সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে মেয়েদের নীরব থাকাই ছিল অলিখিত নিয়ম।

১৯৬৫ সালে প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রীয় বৃত্তি নিয়ে রওনক জাহান পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে গিয়ে তাঁকে সম্পূর্ণ বিপরীত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখস্থ করার প্রবণতা বেশি ছিল, সেখানে হার্ভার্ডে তাঁকে শিখতে হয়েছিল পড়া বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা, যুক্তি প্রদর্শন এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করা। বাংলা মাধ্যমে পড়ে আসা রওনক জাহানের জন্য ইংরেজিতে ক্লাস করা এবং বিশ্বের সেরা মেধাবীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ছিল এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া সে সময় হার্ভার্ডের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য; বছরে প্রায় ৪০ জন পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা ছিল মাত্র চার-পাঁচজন, যাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যকই শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি অর্জন করতে পারতেন।

কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ১৯৬৮ সালে হার্ভার্ড থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ সম্পন্ন করেন রওনক জাহান। এরপরই তিনি শুরু করেন তাঁর পিএইচডি গবেষণা। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির সংকট। তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসনের অধীনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণা করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তা সত্ত্বেও ১৯৬৮-৬৯ সালে তিনি এই গবেষণাটি সফলভাবে পরিচালনা করেন। তাঁর এই গবেষণাপত্রটিই পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে ‘Pakistan: Failure in National Integration’ নামে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়, যা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের রাজনৈতিক পটভূমি বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দলিল।

১৯৭০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর তাঁর অনুভূতি ছিল এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার মতো। ডিগ্রি লাভের পর রওনক জাহান দেশে ফিরে এসে ১৯৭০ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, তুলনামূলক রাজনীতি, রাজনৈতিক উন্নয়ন ও গবেষণাপদ্ধতি পড়াতেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে নারী অধিকার ও নারী উন্নয়ন নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭৩ সালে তিনি দেশের অন্যতম প্রথম নারী বিষয়ক গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংগঠন ‘Women for Women’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন।

পরবর্তী সময়ে রওনক জাহানের কর্মক্ষেত্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত হয়। তিনি জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় নারী ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেন। হার্ভার্ডের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। পিএইচডি চলাকালীন ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি হার্ভার্ডের গভর্নমেন্ট ডিপার্টমেন্টে টিচিং ফেলো এবং ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত হার্ভার্ডের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স ও কেনেডি ইনস্টিটিউটে রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হন। তরুণীদের উদ্দেশ্যে তাঁর জীবনের শিক্ষা হলো—স্বপ্ন দেখতে হবে, বাধা এলেও সেই স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি হার্ভার্ডের Center for International Affairs ও Kennedy Institute-এ Research Associate হিসেবে কাজ করেন।

এর আগে ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত হার্ভার্ডের Government Department-এ Teaching Fellow ছিলেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh

Recent Posts

শাহ আলীতে পলিথিন ব্যাগ থেকে নবজাতক উদ্ধার, ৯৯৯-এ ফোন

রাজধানীর শাহ আলী থানার ডি ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের পাশে একটি কালো পলিথিনের ব্যাগ থেকে…

7 minutes ago

সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতা

সৌদি আরবের মক্কা নগরীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতা…

13 minutes ago

রাজশাহীতে মাদকাসক্ত ছেলের হাসুয়ার কোপে মা নিহত, বাবা আহত

রাজশাহীর মোহনপুরে মাদকাসক্ত ছেলের হাসুয়ার কোপে মা জান্নাতুন নিহত হয়েছেন। এ সময় বাবাকে কুপিয়ে জখম…

28 minutes ago

সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত গোবিপ্রবির ৫ শিক্ষার্থী

১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থী সিভিল…

38 minutes ago

মক্কা-জেদ্দাসহ সৌদির বিভিন্ন এলাকায় সিভিল ডিফেন্সের সতর্কতা জারি

সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কাসহ দেশটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য বিপদ বা ঝুঁকির বিষয়ে…

1 hour ago

আ.লীগ ফিরলে জামায়াত নেতাদের আবারও ফাঁসি দেবে: রাশেদ খাঁন

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেছেন, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরাতে জামায়াত অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি জামায়াত…

1 hour ago

This website uses cookies.