Header Premium (728×90)

শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অনীহা, কোচিং বাণিজ্যে জিম্মি শিক্ষার্থীরা

রাজধানীসহ সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলোতে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠছে, শিক্ষকরা ক্লাসে নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পাঠদান না করে দায়সারাভাবে শুধু সিলেবাস শেষ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে নানা অজুহাতে শিক্ষকরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছেন, যার ফলে শিক্ষার্থীরা পড়া ঠিকমতো আয়ত্ত করতে পারছে না। অথচ শ্রেণিকক্ষে অনীহা দেখালেও অনেক শিক্ষকই প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যে ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং শিক্ষার্থীদের সেখানে যেতে নানাভাবে উৎসাহিত বা বাধ্য করছেন।

এর ফলে শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি মেটাতে শিক্ষার্থীদের কোচিং, প্রাইভেট ও গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভরশীলতা দিন দিন বাড়ছে। এতে অভিভাবকদের আর্থিক ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘ সময় পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার প্রতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ের ব্যবহারও বন্ধ হচ্ছে না। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্লাসে পড়ার মান অত্যন্ত নিম্নমুখী হওয়ায় অভিভাবকদের দাবির মুখে ২০১২ সালে একটি ‘কোচিংবাণিজ্যবিরোধী নীতিমালা’ করা হয়েছিল। ২০১১ সালে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলুর করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এই নীতিমালা করা হলেও এক যুগেও এর কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। নীতিমালায় শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না এবং প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জনকে পড়াতে পারবেন বলা হলেও তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ২০২১ সালের ‘সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান : চাহিদা এবং শিক্ষা প্রদানের মধ্যে শূন্যতা’ শীর্ষক জরিপ অনুযায়ী, সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রত্যাশিত শিক্ষা না পেয়ে তারা চড়া মূল্যে কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভর করছে, যেখানে শিক্ষার মান নিয়ে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষক সংকট, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দূরত্ব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত বাজেট ও শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের অভাবেই শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, শিক্ষকদের বেতনের বিনিময়ে যে দায়িত্ব পালন করার কথা, সেখানে কোনো ঘাটতি থাকা উচিত নয়। সরকারের কার্যকর তদারকির পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, তেজগাঁও সরকারি হাইস্কুল ও আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকদের বক্তব্যে একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের অভিভাবক সারওয়ার খান কাওসার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, শিক্ষক দেরিতে আসেন বা ক্লাস বাতিল হয়, অথচ শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির জন্য জরিমানা নেওয়া হয়। তেজগাঁও সরকারি হাইস্কুলের তৃতীয় শ্রেণির এক অভিভাবক জানান, স্কুলে নামমাত্র ক্লাস হওয়ায় শিক্ষকদের কাছে সন্তানদের প্রাইভেট পড়াতে তারা বাধ্য হচ্ছেন। খুলনার এক স্বনামধন্য স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবকও জানান, শিক্ষকরা ক্লাসের চেয়ে বাইরে পড়াতে বেশি আগ্রহী। তবে কওমি ও আলিয়া মাদরাসায় পাঠদানের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সেখানে কোচিংবাণিজ্যের প্রভাব নেই। অন্যদিকে বিশেষায়িত ও কিছু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাঠদানের মান তুলনামূলক ভালো।

এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার মানোন্নয়নে বর্তমান সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সেন্ট্রাল অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। গত ১০ জুলাই মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে গুগল ফর্মে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে সব প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অন্যথায় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রফেসর নাজমুল হক জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষার মান বাড়াতে এই অনলাইন মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু মনে করেন, সরাসরি মাঠপর্যায়ে তদারকি না করে শুধু অনলাইন মনিটরিংয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। তিনি কোচিংবাণিজ্য বন্ধে কঠোর আইন ও শাস্তির দাবি জানান।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম জানান, করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে এবং অনেক অভিভাবকও বাসায় সময় দিতে পারেন না। তিনি ক্লাসের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিক্ষকদের কোচিংমুখী আচরণের কারণে উপস্থিতি কমছে কি না, সে বিষয়ে নজর দেওয়া হবে। এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় শিক্ষার উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাজেটে শিক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং কারিকুলাম পরিমার্জন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দুটি নতুন বই অন্তর্ভুক্তির কাজ চলছে। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানান, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে তাদের সম্মানী বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময় শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু মানবসম্পদের কোনো উন্নতি হয়নি; তাই শিক্ষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও সম্মানী বৃদ্ধি ছাড়া ভালো কিছু প্রত্যাশা করা যায় না।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের দুই প্রশাসনিক পদে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগ

বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা পদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুই…

7 minutes ago

জাতিসংঘের বিকল্প কেবলই কল্পনাতীত: ড. খলিলুর রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, জাতিসংঘ নিখুঁত নয়, তবে এটি অপরিহার্য এবং…

14 minutes ago

পুলিশের দাবি উন্নতি, বাস্তবে জনমনে নিরাপত্তাহীনতা ও উৎকণ্ঠা

পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতির দাবি করা হলেও বাস্তবে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও…

20 minutes ago

পাকিস্তানে অনলাইনে যৌন নিপীড়নের ফাঁদে ১৫ লাখ শিশু

ইউনিসেফের তথ্যমতে, পাকিস্তানে গত এক বছরে আনুমানিক ১৫ লাখ শিশু অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।…

30 minutes ago

গাজায় বিশ্ববাসীর নিষ্ক্রিয়তা লজ্জাজনক: জাতিসংঘে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গাজা নিয়ে বিশ্ববাসীর নিষ্ক্রিয়তাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল…

42 minutes ago

গাইবান্ধা সরকারি কলেজে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন বরণ অনুষ্ঠিত

গাইবান্ধা সরকারি কলেজে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে।

44 minutes ago

This website uses cookies.