জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচ ও ধানের দর বৃদ্ধি এবং মৌসুমি প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চালের দাম আরেক দফা বেড়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার বাড়তি খরচে নাভিশ্বাস ওঠা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশে, যা বিগত এক বছরের দাম বাড়ার গড় হারকে নির্দেশ করে।
রাজধানীর চাল ব্যবসায়ীদের মতে, পরিবহন ভাড়া ও ধানের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাওন জানান, পাইকারিতে কেজিতে ১ টাকা বেড়ে সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৬ টাকায় এবং মাঝারি মানের চালের দাম ১ টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ টাকা ৫০ পয়সায়। তবে মোটা চালের দামে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্তমানে ওই বাজারে ২৫ কেজির এক বস্তা সরু চাল ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং মাঝারি চাল ১ হাজার ২১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাওন আরও জানান, ডিজেলের দাম বাড়ার পর কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় চালের এক ট্রাক ভাড়া ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৪ হাজার টাকা হয়েছে। একই বাজারের ব্যবসায়ী মামুনুর রশিদ ও কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা মহিউদ্দিন সরকার সাইফুল জানান, মৌসুম শেষ হয়ে আসা, কিছু অঞ্চলে সদ্য আমন ধান কাটা শুরু হওয়া এবং ধানের চড়া দামের কারণেই মূলত বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। তবে মামুনুর রশিদের মতে, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে চালের দর কিছুটা কম রয়েছে।
অথচ বাজার পরিস্থিতির ঠিক বিপরীত অবস্থান প্রকাশ করেছেন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তিনি বলেন, 'এখন চালের দাম বাড়ার কোনো কারণই নেই। আমি মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিচ্ছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে সরকার কঠোর। চালের দাম বাড়ানোর সুযোগ ও কোনো কারণ নেই।' সরকার এখনই চাল সংগ্রহ করবে না উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, মিল মালিকরা সরকারকে চাল দিতে চাইলেও কিছুদিন পর তাদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করা হবে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে কোনো ধরনের খরচ বাড়লে তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবিকায় আঘাত হানে। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হচ্ছে এবং নতুন করে আরও মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ছে। এ অবস্থায় নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান দুর্বল বাজার মনিটরিংকে দায়ী করে বলেন, 'জ্বালানির দর বাড়ায় পরিবহন খরচ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু একে অজুহাত বানিয়ে অতিরিক্ত দাম বাড়ানো মেনে নেওয়া যায় না। ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।'
ঢাকার পাইকারি ও খুচরা বাজারে বর্তমানে সরু চাল কেজিপ্রতি ৭৪ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৭২ টাকা। মাঝারি মানের চালের কেজি ৫৫-৬২ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮-৬৫ টাকায় উঠেছে। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। কিন্তু সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যের সঙ্গে বাজারের এই চিত্রের অমিল দেখা গেছে। টিসিবির দাবি, গত এক সপ্তাহে চালের দাম বাড়েনি, বরং সরু চালের দাম কেজিতে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। তবে এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে স্বীকার করেছে সংস্থাটি। এছাড়া টিসিবি ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এই সময়ে মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫৫-৬৫ টাকা এবং সরু চাল ৭৫-৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি দোকানের ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীরা জানান, দিনাজপুরের চালের ট্রাকে প্রায় ৩ হাজার টাকা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আনতে ট্রাকপ্রতি ২ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এর ফলে কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা দর বাড়াতে তারা বাধ্য হচ্ছেন। মিরপুরের বাসিন্দা মারুফ এবং নতুন বাজারের ক্রেতা নওশাদ আলী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ৬০ টাকায় কেনা আটাশ চাল মাসের শেষে ৬২ টাকা এবং বর্তমানে ৬৪ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
দেশের প্রধান চাল উৎপাদন কেন্দ্র কুষ্টিয়া ও নওগাঁর চালকল মালিকরাও দাম বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলমালিক সমিতি কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রধান জানান, মিলগেটে গত এক মাসে চালের দাম কেজিতে ১-২ টাকা বেড়ে সরু চাল ৫৫-৬৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই সময়ে ধানের দাম মণপ্রতি ১,১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১,২৪০ টাকা হয়েছে। ধান শুকানোর কারণে ওজন কমে যাওয়া এবং ডিজেলের দর বৃদ্ধিকে তিনি দায়ী করেন। নওগাঁ ধান-চাউল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা বলেন, গত পাঁচ দিনে সরু চালের পাইকারি দর মণে ৩০-৫০ টাকা বেড়ে ২,০৫০ থেকে ২,০৮০ টাকায় (৩৭.৩২ কেজি) ঠেকেছে। এটি মৌসুমের শেষভাগে একটি স্বাভাবিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামে গত ১৭ সেপ্টেম্বর চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা ও খুচরা বাজারে ৪-৫ টাকা বাড়ার পর জেলা প্রশাসন মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে মিলগেটে দর কেজিতে ১ টাকা কমানো এবং দুই সপ্তাহ স্থিতিশীল রাখার সিদ্ধান্ত হলেও চারদিনের মধ্যে মিনিকেট চালের দর ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ ও পরে ৭২ টাকায় পৌঁছায়। কুষ্টিয়ার পৌর বাজারে তা খুচরায় ৭৪ টাকায় উঠে যায় এবং সম্প্রতি আরও ১-২ টাকা বেড়েছে। কুষ্টিয়ার এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাইস মিল মালিক এবং দেশ এগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল খালেক বলেন, ধান, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের দরে চাল সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। তারা নিয়মিত পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় মূল্য পর্যালোচনার দাবি জানান।
চালের পাশাপাশি ঢাকার সবজির বাজারও চড়া। বেশিরভাগ সবজি কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগাম শীতকালীন শিম ১৫০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৭০ টাকা, মূলা ৭০ টাকা, লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা ও টমেটো ১২০-১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বরবটি, ঝিঙা ও করলা ৮০ টাকা এবং কচুরমুখি ৮০ টাকা কেজিতে মিলছে। লাউ প্রতি পিস ৪০-৬০ টাকা এবং সাধারণ শসা ৫০-৬০ টাকা হলেও দেশি শসা ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে তুলনামূলক সস্তা পেঁপে ৩০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে। সরবরাহ বাড়ায় কাঁচা মরিচের দাম ২০০ টাকা থেকে কমে এখন ১২০-১৪০ টাকায় নেমে এসেছে। নবোদয় বাজারে সবজি কিনতে আসা ক্রেতা আবু সাঈদ জানান, সামান্য কয়েকটি সবজি কিনতেই অনেক টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে আমিষের বাজারে ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৮০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩১০ টাকা এবং গরুর মাংস ৮০০ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে ডিমের বাজারে স্বস্তি নেই; ফার্মের মুরগির ডিম ডজনপ্রতি ১৫৫-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং পাড়া-মহল্লার দোকানে তা ১৬৫ টাকায় (প্রতি হালি ৫৫ টাকা) গিয়ে ঠেকছে। মাছের বাজারে তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২ও-২৩০ টাকা, রুই-কাতলা ৩৮০-৪২০ টাকা (মাঝারি ৩০০-৩৫০ টাকা, বড় ৪৫০- ৫০০ টাকা), চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং চাষের শিং ৩০০-৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা এবং চিংড়ি ১,০০০-১,৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মাছ বিক্রেতা রমিজ উদ্দিন বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে চাহিদা বেশি থাকায় এবং সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে ২০০ টাকার নিচে এখন খুব কম মাছই পাওয়া যাচ্ছে।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই মাছের বাজারেও ক্রেতাদের বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। তেলাপিয়া কেজিপ্রতি ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা ও রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম আকার ও মানভেদে কেজিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। এ ছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা ও বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কই পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ টাকায়, পোয়া ২৬০ টাকা কেজি দরে। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে।
মাঠের অনবদ্য পারফরম্যান্স এবং সামাজিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে স্পেনে মর্যাদাপূর্ণ 'প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড ২০২৬'…
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর স্বজনদের…
শ্রেণিকক্ষের জটিল সমীকরণ আর সুরের মূর্ছনা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে নিজের জীবন সাজিয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.…
সিরাজগঞ্জের তাড়াশের ইসলামপুর গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন পুরনো আম ও বটগাছ রাতের আঁধারে কেটে বিক্রির…
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের পর এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে…
রাজধানীর মিরপুরে ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় স্বস্তি ফিরলেও স্থায়ী সমাধান নিয়ে সংশয় রয়েছে। একই সঙ্গে মোহাম্মদপুর…
This website uses cookies.