Header Premium (728×90)

লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের দাপট, যেভাবে চলছে তাদের ২৫০ কোটি ডলারের অর্থনীতি

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করছে হুতি বিদ্রোহীরা। তবে নতুন দখল করা এলাকাগুলো থেকে তারা কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকেরা। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও, হুতিরা ইতিমধ্যে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এক বিশাল সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তুলেছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে কর, শুল্ক, জাকাতসহ বিভিন্ন রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে হুতিরা। মোকা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জুলাই মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সমান্তরাল ব্যবস্থার মাধ্যমে হুতিরা বছরে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তহবিল সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ কোটি ডলার আসে শুল্ক ও কর থেকে এবং আরও ৬০ কোটি ডলার আসে বিভিন্ন অতিরিক্ত ফি ও আদায় থেকে। এ ছাড়া যুদ্ধের জন্য নগদ ও পণ্যসহায়তা হিসেবে প্রায় ৩০ কোটি ডলার পেয়ে থাকে তারা। বাকি অংশ আসে ব্যবসা, পরিবহন, সেবা ও বিভিন্ন মাশুল বাবদ অতিরিক্ত খরচ থেকে।

হুতিদের এই অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শুধু কর আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের তথ্যমতে, বিদেশি কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা ৪ হাজার ২২৫টি বাণিজ্যিক এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে হুতি কর্তৃপক্ষ। যদিও হুতিরা দাবি করেছে, তিন বছর ধরে নিবন্ধন নবায়ন না করায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে ইয়েমেন অ্যান্ড গালফ সেন্টার ফর স্টাডিজের অর্থনীতি গবেষক হুসাম আল-সাইদি মনে করেন, এটি বেসরকারি খাতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ। এর মাধ্যমে হুতিদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজস্ব অর্থের প্রবাহ বজায় থাকে। মোকা সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় ৬৮ হাজার বাণিজ্যিক নথির ২৬ শতাংশ সাধারণ বাণিজ্য ও আমদানি এবং ১৮ শতাংশ খাদ্যপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তবে হুতিরা বেসরকারি খাত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, তাদের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য দেশীয় উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার এবং ব্যবসা সহজতর করা।

অভ্যন্তরীণ আয়ের পাশাপাশি তেলবাণিজ্য ও চোরাচালানকে হুতিদের অন্যতম প্রধান আর্থিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ তেল বিক্রির মাধ্যমে হুতিরা বছরে ২০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে, যার জোগান দেয় ইরান। দুবাইভিত্তিক বিভিন্ন ইরানি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে এই লেনদেনগুলো সম্পন্ন হয়। হুসাম আল-সাইদি জানান, চোরাচালানের মাধ্যমে আনা তেল দেশের বাজারে একচেটিয়া দামে বিক্রি করে বড় অঙ্কের মুনাফা করে হুতিরা। এই অর্থ পাচার ও লেনদেনে ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং স্থানীয় মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের জটিল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়। যদিও হুতিরা ইরানি জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

হুতিদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নানা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘ফরেন টেররিস্ট অর্গানাইজেশন’ এবং ‘স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। জাতিসংঘেরও অস্ত্রসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণেই লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি বা মোকা উপকূলের নিয়ন্ত্রণ থেকে হুতিদের সরাসরি বড় কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন আল-জাজিরার ইয়েমেনবিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি। তাঁর মতে, এই অগ্রযাত্রা মূলত একটি ভৌগোলিক ও সামরিক অর্জন, যা নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এদিকে হুতিদের এই বিশাল রাজস্ব আদায়ের বিপরীতে ইয়েমেনে চরম অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট চলছে। গত মার্চ মাসে জাতিসংঘের এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশটির প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বছরের পর বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা বেতন পাচ্ছেন না, অথচ নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। আহমেদ আল-শালাফি বলেন, হুতিরা যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক কর ও চাঁদা আদায় করছে এবং সামরিক ব্যয়ের অজুহাতে বেতন পরিশোধে বিলম্ব করছে। অন্যদিকে হুতিদের দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এডেনে সরিয়ে নেওয়া এবং তেল-গ্যাসের রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে তারা বেতন দিতে পারছে না, যার জন্য তারা সৌদি আরবকে দায়ী করে। বর্তমানে ইয়েমেনে দুটি পৃথক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। গবেষক আল-সাইদির মতে, এই বিভক্ত অর্থনীতি থেকে মুক্তি পেতে হলে হয় সামরিকভাবে কোনো এক পক্ষকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে, অথবা একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

আপা আর ফিরে আসবে না, খুনিদের ছাড় নেই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেছেন, আওয়ামী…

19 minutes ago

বারিধারায় গাড়িচাপা: কিশোর চালক আজান আলী শরীফ অবশেষে গ্রেপ্তার

রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বিশ্রামরত নির্মাণ শ্রমিক মেহেদী হাসানকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় কিশোর চালক আজান…

24 minutes ago

সম্ভাবনা থেকে সংকটে গণঅধিকার পরিষদ: রাজনীতির মাঠে টিকে থাকার লড়াই

নতুন ধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক কৌশলের…

36 minutes ago

মাস্টার্স পরীক্ষার আগেই বিচারক হলেন ইবির রাজু আহমেদ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের শিক্ষার্থী রাজু আহমেদ ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় ২৬তম…

36 minutes ago

শাল্লায় বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত

সুনামগঞ্জের শাল্লায় দেশে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিবাদে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও…

46 minutes ago

সিলেটে সওজের সরকারি জমিতে গোরস্থান নির্মাণের চেষ্টা, কাজ বন্ধ

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার পাঠানপাড়ায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের জমিতে দেয়াল তুলে গোরস্থান তৈরির চেষ্টা করা…

57 minutes ago

This website uses cookies.