Header Premium (728×90)

Categories: সারাদেশ

ড্রেজার দিয়ে পুকুর ভরাট: বরিশালে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে কাউনিয়া

বরিশাল নগরীর পরিবেশ ও প্রাণপ্রকৃতির ওপর এক মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নগরীর কাউনিয়া ও এর আশপাশের এলাকায় পুকুর এবং নিচু জলাশয় ভরাটের এক সর্বগ্রাসী মহোৎসব শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ মদদে তালতলী ও কীর্তনখোলা নদী থেকে বালু এনে দিনরাত ভরাট করা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে টিকে থাকা প্রাকৃতিক জলাধারগুলো। প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে কাউনিয়া এলাকাটি ধীরে ধীরে বালুচরে পরিণত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলার তালতলী ও কীর্তনখোলা নদীতে নোঙর করা বড় বড় বাল্কহেড থেকে শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে শহরের ভেতরে বালু পাঠানো হচ্ছে। লোকচক্ষুর আড়ালে কাজ সারতে ভরাট চক্রটি বেছে নিয়েছে রাতের অন্ধকারকে। প্রতিদিন গভীর রাতে ৮টি ড্রেজারের সাহায্যে প্রায় ২২টি দীর্ঘ পাইপলাইন চালু করে একের পর এক পুকুর ও জলাশয়ে বালু ফেলা হচ্ছে। বর্তমানে নগরীর ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড পুরোটাই এই অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেছে। বিশেষ করে কাউনিয়ার পুরান পাড়া, কাউনিয়া হাউজিং, টেক্সটাইল মোড়, রোকেয়া আজিম সড়ক, তোফাজ্জেল হোসেন সড়ক, ময়লা খোলা, কাউনিয়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকা, মনসা গলি, কাউনিয়া ১ম গলি এবং বিসিক এলাকার অলিগলিতে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে ড্রেজারের ক্ষতিকর পাইপ সংযোগ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা পরিবর্তনের পরপরই এই জলাশয় ভরাট চক্রটি চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই পুরো নদী ও ড্রেজার সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শামসুদ্দোহা আবিদের নাম উঠে এসেছে। দলীয় পটপরিবর্তন হলেও আবিদের এই অবৈধ সাম্রাজ্যে কোনো চির ধরেনি। তিনি নিজে আড়ালে থেকে সহযোগীদের মাধ্যমে তালতলী, কীর্তনখোলা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ড্রেজারগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। ব্যবসা নির্বিঘ্ন রাখতে তিনি এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, থানা পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের একশ্রেণির সড়ক পরিদর্শককে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা বা মাসোহারা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গোপনীয়তার শর্তে কালিজিরা এলাকার এক ড্রেজার মালিক স্বীকার করেছেন যে, আবিদ পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। তিনি জানান, ড্রেজার চালাতে গেলে বিভিন্ন স্তরে ৫ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এমনকি এক প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাকে এককালীন ২০ লাখ টাকাসহ নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে। সবাইকে ম্যানেজ না করে শহরের ভেতর ড্রেজার চালানো অসম্ভব। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক কাউন্সিলর সৈয়দ শামসুদ্দোহা আবিদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

ড্রেজারের এই অবৈধ পাইপলাইনের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কাউনিয়ার পুরান পাড়ার বাসিন্দা ওয়াহাব সিকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাস আটেক আগে একদল যুবক এসে জোর করে তার জমির ওপর ড্রেজারের পাইপ বসিয়ে দেয়। বাধা দিলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। পাইপের কারণে তিনি নিজের জমিতে যাতায়াতের রাস্তাটুকুও তৈরি করতে পারছেন না। রোকেয়া আজিম সড়কের বাসিন্দা লাবলু হাওলাদার জানান, গত এক-দেড় মাসের মধ্যে রোকেয়া আজিম সড়ক এলাকার প্রায় ৭-৮টি পুকুর ভরাট করা হয়েছে। ভরাট শেষে বালুর ওপর দ্রুত ঘাস গজে ওঠায় এখন নতুন কেউ এলে বুঝতেই পারবে না যে সেখানে বিশাল কোনো জলাশয় ছিল।

হাউজিং এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান কামাল বলেন, আইন অনুযায়ী পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের সামনেই ৫০টিরও বেশি ছোট-বড় পুকুর গায়েব হয়ে গেছে। এভাবে আর ৩ মাস চললে কাউনিয়ায় কোনো পানির উৎস অবশিষ্ট থাকবে না। বরিশাল সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুর দিকে এক ঈদের ছুটিতে কাউনিয়ার মনসা গলি এলাকায় একটি পুকুর ভরাটের মধ্য দিয়ে এই চক্রটির তৎপরতা শুরু হয়। এরপর থেকে ক্রমাগত পাইপলাইনের সংখ্যা বেড়েছে এবং সংকুচিত হয়েছে জলাশয়। সম্প্রতি কোস্টগার্ড বেশ কয়েকটি ড্রেজার ও বাল্কহেড আটক করে জরিমানা করলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশালের সমন্বয়ক রফিকুল আলম বলেন, গত ৫০ বছরে বরিশাল নগরীর প্রায় ৭০ শতাংশ পুকুর বিলীন হয়ে গেছে। আশির দশকে হাজারেরও বেশি পুকুর থাকলেও এখন পুরো নগরীতে ব্যবহারযোগ্য পুকুর ৩০০ থেকে ৪০০টির বেশি হবে না। বরিশাল জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সারা দেশে যখন খাল খনন ও জলাধার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন বরিশালে একের পর এক জলাশয় ভরাটের খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যারা পুকুর ও জলাশয় ভরাটের মতো অবৈধ কাজে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন জানান, নগরীতে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাটের অনুমতি আগের প্রশাসনের সময়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ড্রেজারগুলোর বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সড়ক পরিদর্শকদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে এই বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে অস্ত্র হাতে নিচ্ছেন ইরানি নারীরা

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে ইরানের নারীরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছেন। রাজধানী তেহরানে আয়োজিত এক কর্মসূচির অংশ…

14 minutes ago

অক্টোবরে আসছে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ আগামী অক্টোবর থেকে শুরু…

24 minutes ago

বিশ্ববাজারে টানা দ্বিতীয় দিন বাড়ল অপরিশোধিত তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের…

30 minutes ago

কুমিল্লায় পুলিশের রাতভর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আটক ৬২৪

কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে রাতভর কিশোর গ্যাংবিরোধী বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করেছে জেলা…

41 minutes ago

ঘনীভূত গভীর নিম্নচাপ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির পূর্বাভাস

উত্তর আন্দামান সাগর ও তৎসংলগ্ন মিয়ানমার উপকূলে অবস্থানরত নিম্নচাপটি আরও ঘনীভূত হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত…

43 minutes ago

তুরস্ককে ৪-১ গোলে হারিয়ে উয়েফা নেশনস লিগে জয়ে ফিরল ইতালি

বেলজিয়ামের কাছে হারের ধাক্কা সামলে উয়েফা নেশনস লিগে জয়ে ফিরেছে ইতালি। গ্রুপ ‘এ’-এর ম্যাচে তুরস্ককে…

49 minutes ago

This website uses cookies.